তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর কাছে সাংবাদিকদের প্রত্যাশা

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যম কেবল সরকারের কর্মকাণ্ড প্রচারের মাধ্যম নয়; বরং রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডের ইতিবাচক দিক তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারের ভুল, অনিয়ম, দুর্নীতি ও জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলাও সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীর কাছে সাংবাদিক সমাজের প্রত্যাশাও অনেক।
বর্তমান সময়ে দেশের গণমাধ্যম নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব, মালিকানাগত স্বার্থ, পেশাগত অনিশ্চয়তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতিযোগিতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি সংবাদপেশার ভেতরেও কিছু গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে বিগত সময়ে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় থাকা কিছু সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীর ভূমিকা নিয়ে সাংবাদিক সমাজে নানা আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ, প্রভাব বিস্তার কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি—কেউ কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করেন বলেই তাকে সাংবাদিকতা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সাংবাদিকের রাজনৈতিক মত বা ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকতে পারে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে পেশাগত নিরপেক্ষতা, সত্যনিষ্ঠা ও জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। অতীতে কোনো সাংবাদিক রাজনৈতিক ক্ষমতার সুবিধাভোগী ছিলেন কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি এখন সাংবাদিকতার নীতিমালা মেনে চলছেন কি না।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর কাছে তাই আমাদের প্রথম প্রত্যাশা—গণমাধ্যমকে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়, পেশাগত মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়নের পরিবেশ তৈরি করা। কোনো সাংবাদিক যদি ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন, আবার কেউ ভিন্ন মতের কারণে হয়রানির শিকার হন—এমন বৈষম্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। একইভাবে অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার, মিথ্যা তথ্য প্রচার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ কিংবা সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
‘গুপ্ত সাংবাদিক’ বা সাংবাদিকতার পরিচয় আড়াল করে রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক কিংবা অন্য কোনো স্বার্থে তথ্য সংগ্রহ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে গুজব, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা উচিত নয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ এবং স্বচ্ছ তদন্তের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষার নামে অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি অভিযোগের অজুহাতে প্রকৃত সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করাও সমান ক্ষতিকর।
আমরা মনে করি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে সাংবাদিক সরকারকে প্রশ্ন করতে পারবেন, বিরোধীদের বক্তব্য প্রকাশ করতে পারবেন এবং সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা নির্ভয়ে তুলে ধরতে পারবেন। কোনো সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিককে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করা, বিজ্ঞাপন বন্ধের ভয় দেখানো কিংবা প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও আত্মসমালোচনার জায়গা তৈরি করতে হবে। সাংবাদিকতা কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রের ভূমিকা নয়। কোনো দলের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে প্রচারণা চালানো সংবাদপেশার মূল দায়িত্ব হতে পারে না। সংবাদ ও মতামতের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা, তথ্য যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং ভুল হলে তা স্বীকার করে সংশোধন করা—এসবই পেশাদার সাংবাদিকতার মৌলিক শর্ত।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর কাছে আরও প্রত্যাশা, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা, হুমকি কিংবা পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত নয়। সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম মালিকদেরও সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন, চাকরির নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
দেশের গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করতে হলে কেবল নতুন আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং পেশাগত জবাবদিহি। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এমন একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে সাংবাদিকের পরিচয় নয়, তার কাজের মান ও পেশাগত আচরণই হবে মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি।
আমরা এমন কোনো গণমাধ্যম চাই না, যা সরকারের প্রশংসায় ব্যস্ত থাকবে; আবার এমন গণমাধ্যমও চাই না, যার একমাত্র লক্ষ্য সরকারের বিরোধিতা করা। আমরা চাই সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা, প্রশ্ন করার অধিকার এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সাংবাদিকতা। অতীতে যারা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন, তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই হতে পারে; কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর সামনে তাই বড় দায়িত্ব—গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ নয়, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল করে তোলা। সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন নয়, পেশাগত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা। রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, সত্য ও জনস্বার্থকে সাংবাদিকতার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনা। গণমাধ্যম যদি স্বাধীনভাবে সত্য বলতে পারে এবং সাংবাদিকরা যদি ভয় ও পক্ষপাতমুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারেন, তবেই একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী হবে।