এসএসসির ফল বিপর্যয়: দায় শুধু শিক্ষার্থীদের নয়

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার এবারের ফলাফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে আসা এবং প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া শুধু একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো পরিবার, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক মান নিয়ে বড় প্রশ্ন। প্রায় দুই দশকের মধ্যে এমন নিম্ন পাসের হার এটাই প্রথম—তাই বিষয়টিকে কোনোভাবেই সাধারণ ফলাফল হিসেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ফল প্রকাশের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ দুটি বিষয়ে অকৃতকার্যের হার বেশি হওয়ায় সামগ্রিক ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বছরের পর বছর যদি একই বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা দুর্বল থাকে, তাহলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না কেন?
শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার জন্য কেবল তাদের পড়াশোনায় অমনোযোগ, মোবাইল ফোনের ব্যবহার কিংবা প্রস্তুতির ঘাটতিকে দায়ী করা সহজ। কিন্তু একটি শিক্ষার্থী কেন গণিত বা ইংরেজিতে দুর্বল হয়ে পড়ছে, সেই প্রশ্নের গভীরে যাওয়া জরুরি। বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক আছেন কি না, নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে কি না, শিক্ষকরা আধুনিক পদ্ধতিতে পড়াতে পারছেন কি না, শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো বুঝে শেখার সুযোগ পাচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের কঠোরতা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। কঠোর মূল্যায়ন অবশ্যই শিক্ষার মান নিশ্চিত করার একটি উপায় হতে পারে। পরীক্ষার্থীরা যা লিখেছে, তার ভিত্তিতেই নম্বর পাওয়া উচিত। কিন্তু মূল্যায়নের কঠোরতা যদি হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফলাফলে অস্বাভাবিক পতন ঘটায়, তাহলে সেই পদ্ধতিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কঠোরতা ও মানসম্মত মূল্যায়নের মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি।
এবারের ফলাফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ছাত্র ও ছাত্রীর ফলাফলের ব্যবধান। ছাত্রীদের পাসের হার যেখানে ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, সেখানে ছাত্রদের ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এই ব্যবধান কেন তৈরি হচ্ছে, সেটিও আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। একইভাবে শিক্ষা বোর্ড, অঞ্চল, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ফলাফলের যে বড় পার্থক্য রয়েছে, তার কারণও অনুসন্ধান করতে হবে।
করোনাকালীন সময়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও পরিবর্তিত পরীক্ষা ব্যবস্থার কারণে কয়েক বছর তুলনামূলক বেশি পাসের হার দেখা গেছে। পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও স্বাভাবিক পরীক্ষা ব্যবস্থায় ফিরে আসার পর ফলাফলে বড় পতন ঘটেছে। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট—শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার সক্ষমতা এবং পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি ব্যবধান তৈরি হয়ে থাকতে পারে। কেবল ভালো ফলের সংখ্যা বাড়ানো শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রমাণ নয়।
বরং এবারের ফলাফলকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। কোন অঞ্চলের কোন ধরনের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি ফেল করছে, কোন বিষয়ে দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি, শিক্ষক সংকট কোথায়, বিদ্যালয়ে পাঠদানের মান কেমন—এসব তথ্যের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রয়োজন। শুধু ফল প্রকাশের সময় ‘কারণ খতিয়ে দেখা হবে’ বললে চলবে না; সেই তদন্তের ফলাফল প্রকাশ এবং তার ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপও নিতে হবে।
বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের জন্য দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে বিদ্যালয়ভিত্তিক সহায়ক শিক্ষা, অতিরিক্ত ক্লাস, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মানবিক ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়ভিত্তিক বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, জবাবদিহি ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান নিশ্চিত করাও জরুরি।
আর একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না—একজন শিক্ষার্থীর ফেল মানে শুধু একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা নয়। এর সঙ্গে তার মানসিক চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা, আর্থিক ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন জড়িয়ে থাকে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী যখন একই সময়ে ব্যর্থ হয়, তখন সেটিকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হয়।
শিক্ষামন্ত্রী ফলাফলকে ‘সুন্দর’ বলেছেন—এটি তাঁর মূল্যায়ন হতে পারে। কিন্তু প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং পাসের হার দুই দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা সমস্যার সমাধান করবে না। ফল ভালো না খারাপ—এই বিতর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কেন এমন ফল হলো এবং আগামী বছর কীভাবে পরিস্থিতির উন্নতি করা যায়।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি শিক্ষার্থীকে পাস করানো নয়; বরং শিক্ষার্থীরা যেন সত্যিকার অর্থে শেখে, বুঝে এবং সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। নম্বরের পেছনে ছুটে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেললে সাময়িকভাবে ফল ভালো হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এবারের এসএসসি ফলাফল তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার জন্য একটি সতর্ক সংকেত। এই সংকেতকে আড়াল না করে কারণ অনুসন্ধান, দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ এবং বাস্তবভিত্তিক সংস্কারের মাধ্যমে কাজে লাগাতে হবে। কারণ একটি পরীক্ষার ফল শুধু শিক্ষার্থীর নয়—পুরো শিক্ষাব্যবস্থার আয়না।