নিখোঁজের পর লাশ, নিরাপদ কোথায় শিশুরা?

একটি শিশু বাড়ি থেকে বের হলো। স্বাভাবিকভাবেই। হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাবে, ছবি তুলবে, তারপর ফিরে আসবে পরিবারের কাছে। কিন্তু সেই ফেরাটা আর হলো না। পরদিন তার মরদেহ পাওয়া গেল একটি ঝোপের মধ্যে। একটি পরিবারের কাছে এর চেয়ে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন আর কী হতে পারে?
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছরের ছেলে অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের সামনে এমনই এক নির্মম বাস্তবতা হাজির করেছে। শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম। এরপর সে আর বাড়ি ফেরেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় নিখোঁজ ডায়েরিও করা হয়। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটসংলগ্ন সানন্দা গ্রামের একটি ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
অপ্রতিমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের বিষয়। তার সঙ্গে কী ঘটেছিল, কীভাবে সে ওই স্থানে গেল, তার মৃত্যুর পেছনে কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর দ্রুত বের করা জরুরি। কারণ একটি শিশুর জীবন এভাবে থেমে যাওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু অপ্রতিমের মৃত্যুকে ঘিরে নয়; প্রশ্ন হলো, আমাদের শিশুরা কতটা নিরাপদ?
শিশুরা স্কুলে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যায়, খেলতে যায়, পরিবারের প্রয়োজনে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়। তাদের প্রতিটি চলাফেরার সঙ্গে যদি অভিভাবকদের মনে ভয় কাজ করে—সন্তানটি নিরাপদে বাড়ি ফিরবে তো?—তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের উদ্বেগ নয়, পুরো সমাজের নিরাপত্তাবোধের সংকট।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার তাকে খুঁজেছে। থানায় জানানো হয়েছে। পরদিন তার মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এখন প্রয়োজন নিখোঁজ হওয়ার মুহূর্ত থেকে মরদেহ উদ্ধারের স্থান পর্যন্ত প্রতিটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের তথ্য, ঘটনাস্থলের আলামত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন—সবকিছু বিশ্লেষণ করে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনতে হবে।
তদন্তের আগে কাউকে দায়ী করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো সম্ভাবনাকেও অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। কোনো অপরাধ হয়ে থাকলে তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন—শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত অনুসন্ধান ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? একটি শিশু নিরুদ্দেশ হওয়ার খবর পাওয়ার পর পরিবারকে যেন একা একা খুঁজে বেড়াতে না হয়। পুলিশ, প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকা হওয়ায় সেখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা দরকার। পর্যাপ্ত সিসিটিভি, আলোকসজ্জা, নিরাপত্তা টহল এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে।
একটি শিশুর মৃত্যুর পর কিছুদিন আলোচনা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ হয়, তদন্তের আশ্বাস আসে। তারপর সময়ের সঙ্গে ঘটনাটি অনেক সময় আড়ালে চলে যায়। অপ্রতিমের ক্ষেত্রে এমনটি যেন না হয়। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেটিও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
আমরা কোনো প্রতিশোধ চাই না, চাই না অনুমাননির্ভর বিচার। আমরা চাই সত্য উদ্ঘাটিত হোক। কেউ অপরাধী হলে আইনের মাধ্যমে তার বিচার হোক। কেউ নির্দোষ হলে তার প্রতি অন্যায় না হোক। আর রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করুক।
অপ্রতিম আর ফিরে আসবে না। তার পরিবারের শূন্যতাও কোনো কিছুর বিনিময়ে পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু তার মৃত্যুর সত্য যদি উদ্ঘাটিত হয়, দায়ীদের বিচার যদি নিশ্চিত হয় এবং এর মাধ্যমে অন্য শিশুদের নিরাপত্তা বাড়ে, তাহলে অন্তত এই মর্মান্তিক ঘটনার একটি সামাজিক অর্থ তৈরি হবে।
একটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু তার পরিবারের দায়িত্ব নয়। একটি শিশুকে নিরাপদে ঘরে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পুরো সমাজের।
অপ্রতিমের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে আবারও প্রশ্ন এসেছে, নিখোঁজ হওয়ার পর যদি শিশুর মরদেহই ফিরে আসে, তাহলে নিরাপদ কোথায় আমাদের শিশুরা?