শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj

জনআস্থা ও পুলিশের নিরাপত্তা—দুটিই জরুরি

জনআস্থা ও পুলিশের নিরাপত্তা—দুটিই জরুরি
ছবি: এআই
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে, তারাই যদি বারবার হামলার শিকার হন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? থানায় ঢুকে পুলিশ সদস্যকে মারধর, দায়িত্ব পালনকালে হামলা, পুলিশ কর্মকর্তার সন্তানকে রক্তাক্ত করা, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের বাড়িতে অস্ত্রের মুখে ডাকাতি কিংবা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্পেশাল ব্রাঞ্চের এসআই আলতাফ হোসেনের নিহত হওয়ার মতো ঘটনা কোনো স্বাভাবিক সমাজের চিত্র হতে পারে না।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এসব ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা ও দায়িত্ব পালনে শঙ্কা। এই শঙ্কা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ওপর।

গত ৬ সেপ্টেম্বর বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় একাধিক মামলার আসামি রিয়াজ ফকিরকে গ্রেপ্তারের পর তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এরপর কয়েকশ মানুষ থানায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। থানায় ঢুকে ডিউটি অফিসারকে মারধরসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে আহত করার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোনো অভিযোগ বা গুজবের ভিত্তিতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এমন প্রবণতা সমাজে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত তৈরি করে।

এরপরও যদি আমরা শুধু ‘জনতার ক্ষোভ’ বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাই, তাহলে সমস্যার মূল কারণ অমীমাংসিতই থেকে যাবে। আবার পুলিশের অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, ক্ষমতার অপব্যবহার বা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগকে অস্বীকার করেও জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেলে আইন প্রয়োগের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

তবে আস্থার ঘাটতি কোনোভাবেই পুলিশকে হামলার বৈধ কারণ হতে পারে না। কোনো পুলিশ সদস্য অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু একজনের অপরাধের দায় পুরো বাহিনীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে হামলা, ভাঙচুর বা হত্যার ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। বিচার পাওয়ার পথ আছে, অভিযোগ জানানোর প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে। জনতা যদি বিচারকের ভূমিকা নেয়, তাহলে আইনের শাসনই দুর্বল হয়ে পড়ে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পুলিশের পরিবারের সদস্যরাও নিরাপত্তাহীনতার কথা বলছেন। কর্মরত পুলিশ সদস্যের সন্তান যদি নিরাপদ না থাকে, অবসরপ্রাপ্ত সদস্যের বাড়িতে যদি অস্ত্রের মুখে ডাকাতি হয়, তাহলে বাহিনীর সদস্যদের মানসিক অবস্থাও সহজেই অনুমেয়। দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের পরিবারকে নিয়েও যদি একজন পুলিশ সদস্য সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকেন, তাহলে তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব আশা করা কঠিন।

এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। পুলিশকে শুধু অস্ত্র, ইউনিফর্ম বা প্রশাসনিক ক্ষমতা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। দায়িত্ব পালনের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, আইনি সুরক্ষা এবং সর্বোপরি পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সদস্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হলে তার তদন্ত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে হবে। অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

একই সঙ্গে পুলিশের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ জনআস্থা একদিনে নষ্ট হয় না, আবার একদিনে ফিরেও আসে না। অতীতে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যায়, রাজনৈতিক প্রভাব, নির্যাতন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার না হলে মানুষের আস্থা ফিরবে না। পুলিশকে জনগণের ভয় নয়, আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, আইন প্রয়োগে হস্তক্ষেপ কিংবা দলীয় স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহারের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে বাহিনীর পেশাদারত্ব প্রশ্নের মুখেই থাকবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইনি পথে সমাধান করতে হবে, হামলা করে নয়।

পুলিশ ও জনগণের দূরত্ব কমানোও জরুরি। কমিউনিটি পুলিশিং, স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মতবিনিময়, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং পুলিশের সেবামূলক ভূমিকা দৃশ্যমান করা যেতে পারে। মানুষকে বুঝতে হবে, পুলিশ কোনো ব্যক্তি বা সরকারের সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের নিরাপত্তার জন্যই এর অস্তিত্ব।

অন্যদিকে পুলিশ সদস্যদেরও মনে রাখতে হবে, জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে আচরণ, পেশাদারত্ব ও মানবিকতার বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় দুর্ব্যবহার কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার জনআস্থার সংকট আরও গভীর করে। তাই সংস্কার শুধু কাঠামোগত নয়, আচরণগতও হতে হবে।

সবশেষে বিষয়টি শুধু পুলিশের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্ন। পুলিশের ওপর ধারাবাহিক হামলা যদি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়, তাহলে অপরাধীরা আরও সাহসী হবে এবং সাধারণ মানুষ আরও অনিরাপদ হয়ে পড়বে। আবার পুলিশ যদি জনআস্থা হারায়, তাহলে আইন প্রয়োগও কঠিন হয়ে উঠবে।

তাই এখনই প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ—পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা, পুলিশের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক পুনর্গঠন। পুলিশ ও জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নয়, দুপক্ষের আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে হবে।

কারণ প্রশ্নটি শুধু ‘পুলিশের ওপর হামলা ঠেকাবে কে’—এটুকু নয়। বড় প্রশ্ন হলো, পুলিশ দুর্বল হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ