রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • ইউক্রেনের অস্ত্রভাণ্ডারে রুশ ড্রোন হামলা, নিহত ৩৭ জুলাই গণহত্যার বিচারসহ ৯ দফা দাবি জানাল অল্টারনেটিভস গুমের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না সালাহউদ্দিন ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে নেপাল–তিব্বতে নিহত ৭৫০, নিখোঁজ ৩ হাজার রংপুরে চার খুন: পুলিশের তদন্তে ১৯ প্রশ্ন, আসামিদের পক্ষে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত আইনজীবীদের রামসু বাজারে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে সেনাবাহিনী, সিন্দুকছড়ি জোনের বিশেষ সহায়তা পরিকল্পনা রাশিয়ায় আন্তর্জাতিক যুব উৎসবে ১৯১ দেশের ১০ হাজার তরুণ, অংশগ্রহণকারী বাছাই সম্পন্ন ডিবিতে ফোন করে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণের ইচ্ছা, মিরপুরে বাড়ি ঘিরে অভিযান গুম-খুন ও জুলাই শহীদদের পরিবারের দায়িত্ব নেবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কায় বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি: বিশ্বব্যাংক
  • রংপুরের চার খুন: প্রশ্নের জবাব চাই, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক

    রংপুরের চার খুন: প্রশ্নের জবাব চাই, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক
    ছবি: এআই
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যের নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের ওপর চালানো ভয়াবহ অপরাধ নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তাবোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থারও বড় পরীক্ষা। একটি বাড়ি থেকে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।

    এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে এবং তাদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কথা জানিয়েছে। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যার কারণ হিসেবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু তদন্তের এই পর্যায়েই থেমে গেলে চলবে না। কারণ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে পুলিশের বক্তব্য ও তদন্ত নিয়ে যে প্রশ্নগুলো তোলা হয়েছে, সেগুলোর যৌক্তিক নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।

    একটি পরিবারের চারজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এমন ঘটনায় অপরাধের কারণ, হত্যার ধরন, হত্যার আগে ও পরের ঘটনাপ্রবাহ, ঘটনাস্থলের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, সন্দেহজনক ব্যক্তিদের চলাচল—প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো একটি স্বীকারোক্তি কিংবা প্রাথমিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে তদন্তের পরিসর সীমিত করা হলে প্রকৃত সত্য আড়ালে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

    রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি পুলিশের তদন্ত নিয়ে ১৯টি প্রশ্ন তুলেছে। এসব প্রশ্নের সবকটিই যে সঠিক বা যৌক্তিক—তা আগেভাগে ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে প্রশ্ন উঠেছে যখন, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সেগুলোর উত্তর দেওয়া। এতে তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং জনমনে তৈরি হওয়া সংশয়ও দূর হবে।

    বিশেষ করে হত্যার পর আসামিরা কীভাবে দীর্ঘ সময় ঘটনাস্থলে অবস্থান করল, বিদ্যুৎ সংযোগের তার কে বা কারা কেটেছিল, অচেনা মোটরসাইকেলের চলাচল ছিল কি না, লুট হওয়া অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কারের হিসাব এবং ইয়াবার পরিমাণ নিয়ে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই পরিষ্কার হওয়া উচিত।

    এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রংপুর আইনজীবী সমিতি গ্রেফতার আসামিদের পক্ষে আপাতত আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কিন্তু ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় একজন অভিযুক্তের পক্ষে আইনগত প্রতিনিধিত্বের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। তাই আবেগ বা জনমতের চাপে যেন বিচারপ্রক্রিয়ার মৌলিক নীতিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

    অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে নির্দোষ। একই সঙ্গে অপরাধের শিকার পরিবারটির ন্যায়বিচারের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, প্রমাণনির্ভর ও স্বচ্ছ। প্রকৃত অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে; আর নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

    দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত না হলে কিংবা অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পেলে তা অন্য অপরাধীদের উৎসাহিত করতে পারে। বিপরীতে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তৈরি করে।

    গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তাঁর পরিবারের অন্য তিন সদস্যেরও জীবন ছিল নিজস্ব স্বপ্ন ও সম্ভাবনায় পূর্ণ। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একটি পরিবারকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই কেবল একটি মামলার বিষয় হতে পারে না। এর সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব জড়িয়ে আছে।

    তাই এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি কাম্য নয়। পুলিশের তদন্ত নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে হবে। প্রয়োজনে স্বাধীন ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের পথও বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ফরেনসিক আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যসহ সব ধরনের প্রমাণ যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে হবে।

    আমরা এমন একটি তদন্ত চাই, যে তদন্ত শুধু আসামি শনাক্ত করবে না; বরং হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেবে। আমরা এমন একটি বিচার চাই, যেখানে অপরাধীর পরিচয় বা প্রভাব কোনো বিষয় হবে না। এবং আমরা এমন একটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা চাই, যেখানে কোনো পরিবার রাতে নিজেদের ঘরে থেকেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে না।

    রংপুরের চার খুনের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হোক। নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার পাক। আর এই হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি শিক্ষা হয়ে উঠুক—মানুষের জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনো দায়িত্ব রাষ্ট্রের হতে পারে না।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ