রাশিয়ায় আন্তর্জাতিক যুব উৎসবে ১৯১ দেশের ১০ হাজার তরুণ, অংশগ্রহণকারী বাছাই সম্পন্ন

রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গে আগামী ১১ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অব ইয়ুথ (IFY)–২০২৬। এ উপলক্ষে অংশগ্রহণকারী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৯১টি দেশের মোট ১০ হাজার তরুণ এ উৎসবে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন।
বিশ্ব যুব উৎসব অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবারের উৎসবে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক সংলাপের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণরা সেখানে নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময়, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
অংশগ্রহণকারী বাছাইয়ের জন্য আয়োজকদের কাছে ১ লাখ ১৩ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছিল। আয়োজকদের দাবি, উৎসব আয়োজনের ইতিহাসে এবারই প্রথম আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে আসা আবেদনের সংখ্যা রাশিয়ার আবেদনকারীদের চেয়ে ৩২ হাজার বেশি হয়েছে।
চূড়ান্ত তালিকায় রাশিয়ার ৫ হাজার এবং অন্যান্য দেশের ৫ হাজার তরুণ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১ হাজার কিশোর-কিশোরীও রয়েছে। এদের ৫০০ জন রাশিয়ার এবং ৫০০ জন অন্যান্য দেশের।
বিশ্ব যুব উৎসব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিমিত্রি ইভানভ বলেন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে এক হাজারের বেশি প্রতিনিধি উৎসবে অংশ নেবেন। এ ছাড়া আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ভারত, চীন, মেক্সিকো ও সৌদি আরবের মতো বিভিন্ন অঞ্চলের দেশ থেকেও বড় প্রতিনিধি দল থাকবে।
ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ইতালিসহ পশ্চিমা দেশগুলোর তরুণরাও উৎসবে অংশ নেবেন। শুধু এই তিন দেশ থেকেই ১০০ জনের বেশি প্রতিনিধি আসবেন বলে জানান তিনি।
আটটি ক্ষেত্রে তরুণদের অংশগ্রহণ
আয়োজকদের মতে, IFY–২০২৬-এর অন্যতম নতুন বৈশিষ্ট্য হলো আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণে খাতভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা। উৎসবে সৃজনশীল শিল্প, বিজ্ঞান, ক্রীড়া, সরকারি প্রশাসন, গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ আটটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের তরুণদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তরুণ বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, ক্রীড়াবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও কনটেন্ট নির্মাতারা রয়েছেন। নিজ নিজ ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে কাজ ও সাফল্যের নজির তৈরি করেছেন এমন তরুণদেরই বাছাই করা হয়েছে।
বুলগেরিয়ার ইভাইলো দানাইলোভ তাঁদের একজন। মাত্র ২৬ বছর বয়সে মেয়র নির্বাচিত হওয়া দানাইলোভ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, ২৬ বছর বয়সে মেয়র হওয়া চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে এরপর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—কম অভিজ্ঞতা নিয়ে কীভাবে একটি শহর পরিচালনা করা যায়, যেখানে পুরো একটি জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব থাকে। বিভিন্ন দেশের সহকর্মীদের কাছ থেকে শেখা এবং এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের তরুণ রাজনীতিকরা স্থানীয় প্রশাসন কীভাবে পরিচালনা করেন, তা জানতে তিনি উৎসবে অংশ নিচ্ছেন।
আফ্রিকা থেকে উদ্যোক্তা, উজবেকিস্তান থেকে এআই গবেষক
কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের ক্রিশ্চিয়ান বাহাতিও উৎসবে অংশ নিচ্ছেন। তিনি একটি বড় খনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ২০১৯ সালে তিনি একটি দাতব্য ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন, যা প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের অসহায় মানুষের সহায়তায় কাজ করছে।
বাহাতির মতে, আন্তর্জাতিক যুব উৎসব শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন নয়; এটি ধারণা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও দায়িত্বশীলতার মিলনস্থল। বিভিন্ন দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রত্যাশা করছেন তিনি।
উজবেকিস্তানের ফাতিমা বোগশোকি কাজ করছেন গ্রামীণ চিকিৎসকদের জন্য একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সহকারী তৈরির প্রকল্প নিয়ে। তাঁর লক্ষ্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া।
তিনি জানান, প্রকল্পটি এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। উৎসবে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রকল্পটি আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে পরামর্শ পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
ভারতের অমিত কোঠাওয়াদেও অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় রয়েছেন। করোনাভাইরাস মহামারির সময় তিনি কোভিড-১৯ আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শ শনাক্ত করার জন্য একটি অ্যাপ তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে তিনি একটি সরকারি সংস্থায় কাজ করছেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশটির স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে ৩৫ হাজার প্রকল্প গড়ে উঠেছে বলে আয়োজকেরা জানিয়েছে।
অংশ নিচ্ছেন কনটেন্ট নির্মাতারাও
উৎসবে বিভিন্ন দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালী তরুণ কনটেন্ট নির্মাতারাও অংশ নেবেন। তাঁদের একজন স্পেনের দিয়েগো রদ্রিগেজ।
রদ্রিগেজ বলেন, এটি রাশিয়ায় তাঁর প্রথম সফর নয়। প্রতিবারই দেশটির প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বাড়ে। আন্তর্জাতিক যুব উৎসবে আমন্ত্রণ পাওয়া তাঁর জন্য সম্মানের বিষয়। মানুষের জীবন, শহর ও আতিথেয়তার মাধ্যমে নিজের দেখা রাশিয়াকে দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে চান তিনি।
এদিকে উৎসবে আমন্ত্রণ পাওয়ার পর বিভিন্ন দেশের তরুণদের আবেগঘন প্রতিক্রিয়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ইনফ্লুয়েন্সার অ্যাঞ্জেলিচা চেরিলিনের একটি ভিডিও তিন মিলিয়নের বেশি বার দেখা হয়েছে। আমন্ত্রণের খবর শুনে আনন্দে কেঁদে ফেলেন তিনি। পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আরও অনেক তরুণ তাঁদের প্রতিক্রিয়া ও উৎসব নিয়ে প্রত্যাশার ভিডিও প্রকাশ করেন।
ইয়েকাতেরিনবার্গে হবে মূল আয়োজন
উৎসবের কর্মসূচিতে তরুণদের পারস্পরিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময়, দলগত কাজ এবং যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্যানেল আলোচনা ছাড়াও খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম ও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণের আয়োজন থাকবে।
উৎসবের মূল ভেন্যু হিসেবে থাকছে ইয়েকাতেরিনবার্গ-এক্সপো আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কেন্দ্র। অংশগ্রহণকারী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা উৎসব চলাকালে উরাল ফেডারেল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন।
২০৩০ সালে ফের বিশ্ব যুব উৎসব
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আন্তর্জাতিক যুব সহযোগিতা উন্নয়নের নির্দেশনার ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ১ থেকে ৭ মার্চ রাশিয়ার সিরিয়াসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্ব যুব উৎসব। এতে ১৯০টি দেশের ২০ হাজার তরুণ নেতা অংশ নিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে এই উৎসবের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিবছর যুবকদের নিয়ে আয়োজন করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে নিজনি নভগোরোদে অনুষ্ঠিত বিশ্ব যুব উৎসবের অ্যাসেম্বলিতে ১২০টি দেশের ২ হাজার তরুণ অংশ নেন।
এবার ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক যুব উৎসবে ১০ হাজার তরুণের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। আর ২০ হাজার অংশগ্রহণকারী নিয়ে পরবর্তী বিশ্ব যুব উৎসব ২০৩০ সালে অনুষ্ঠিত হবে।
আয়োজকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তরুণদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী একটি বৈশ্বিক যুব সম্প্রদায় গড়ে তোলাই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য।