প্রয়োজনের সম্পর্ক, নাকি সত্যিকারের আপনজন?

মানুষ সামাজিক জীব। একা বেঁচে থাকা তার পক্ষে সহজ নয়। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাই মানুষ অন্য মানুষকে কাছে টানে, সম্পর্ক গড়ে তোলে, বন্ধুত্ব করে, ভালোবাসে এবং একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। কিন্তু সব সম্পর্কের ভিত্তি কি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা? সব মানুষ কি সত্যিই আপন হয়ে ওঠে?
বাস্তবতা হলো, অনেক সময় মানুষ তার প্রয়োজনেই অন্য একজনকে আপন করে নেয়। প্রয়োজনের সময়ে যে মানুষটি খুব কাছের বলে মনে হয়, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তার আচরণেও বদল দেখা দিতে পারে। তখন বোঝা যায়, সম্পর্কটির গভীরে ভালোবাসার চেয়ে প্রয়োজনের হিসাবটাই হয়তো বেশি ছিল।
তবে প্রয়োজনের কারণে তৈরি হওয়া প্রতিটি সম্পর্কই যে মিথ্যা, তা নয়। মানুষের জীবনে পারস্পরিক প্রয়োজনও সম্পর্কের একটি স্বাভাবিক অংশ। আমরা বন্ধুর কাছে সহযোগিতা চাই, পরিবারের মানুষের ওপর নির্ভর করি, সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করি। একে অপরের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে সম্পর্ক তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। সমস্যা তখনই, যখন প্রয়োজনের বাইরে মানুষটির প্রতি কোনো মায়া, সম্মান বা দায়িত্ববোধ থাকে না।
কেউ যখন আপনার বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ায়, তখন তার উপস্থিতির মূল্য বোঝা যায়। আনন্দের দিনে অনেকেই সঙ্গী হতে পারে; কিন্তু কঠিন সময়ে যে মানুষটি কোনো স্বার্থ ছাড়াই পাশে থাকে, তার সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা আলাদা। কারণ প্রকৃত আপনজন শুধু আপনার ভালো সময়ের সঙ্গী হন না, খারাপ সময়েও হাতটা ধরে রাখেন।
জীবনে এমন মানুষও আসে, যারা খুব আপন হওয়ার অভিনয় করে। আপনার কথা শোনে, আপনার খোঁজ নেয়, প্রয়োজনের সময় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু তাদের এই ঘনিষ্ঠতার পেছনে যদি কোনো স্বার্থ থাকে, তা একসময় প্রকাশ পায়। প্রয়োজন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়, আগ্রহ হারিয়ে যায়, এমনকি পরিচিত মানুষটিও অচেনা হয়ে ওঠে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা কষ্ট দেয়। মনে হয়, এতদিনের সম্পর্ক তাহলে কী ছিল? এত কথা, এত স্মৃতি, এত বিশ্বাস—সবই কি প্রয়োজনের কাছে আটকে ছিল?
কিন্তু জীবনের একটি কঠিন সত্য মেনে নিতে হয়—সব মানুষকে ধরে রাখা যায় না, সব সম্পর্কও চিরস্থায়ী হয় না। কেউ আসে কিছু শেখাতে, কেউ আসে কিছু সময়ের জন্য, আবার কেউ থেকে যায় জীবনের শেষ পর্যন্ত।
তাই কে কতটা আপন, তা কথায় নয়; সময়ের সঙ্গে তার আচরণেই বোঝা যায়। আপনার প্রয়োজনের সময় যেমন কেউ পাশে থাকে, তেমনি আপনার কোনো প্রয়োজন না থাকলেও যে মানুষটি আপনার খোঁজ নেয়, আপনার আনন্দে আনন্দিত হয় এবং আপনার কষ্টে মন খারাপ করে—তাকেই সত্যিকারের আপন বলা যায়।
সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখন, যখন একে অপরের কাছ থেকে পাওয়ার মতো কিছু থাকে না। স্বার্থের বাইরে গিয়েও যদি কেউ আপনাকে সম্মান করে, আপনার খোঁজ নেয় এবং পাশে থাকার চেষ্টা করে, সেই সম্পর্কই মূল্যবান।
তাই জীবনে মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ার চেয়ে সত্যিকারের মানুষ থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সবাইকে আপন ভাবার প্রয়োজন নেই। বরং সময়ের সঙ্গে মানুষকে চিনতে শেখাই ভালো।
কারণ প্রয়োজন মানুষকে কাছে আনতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা, বিশ্বাস ও মায়াই মানুষকে সত্যিকার অর্থে আপন করে রাখে।