গ্যাস সংকট দীর্ঘ হলে যে বিপদগুলো সামনে আসতে পারে

দেশের চলমান গ্যাস সংকটকে এখন আর কেবল জ্বালানি সরবরাহের একটি সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কোথাও রান্নার চুলা জ্বলছে না, কোথাও সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি, আবার কোথাও শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শিল্প উৎপাদনে। গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট চাপের গ্যাস প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় সরবরাহ বন্ধ থাকলে শুধু উৎপাদন কমে যায় না, অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি চালু রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকদের আয় কমে, উদ্যোক্তারা লোকসানে পড়েন এবং জাতীয় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে পণ্যের দামেও। একটি কারখানায় উৎপাদন কমলে বাজারে সরবরাহ কমে যায়। একই সময়ে চাহিদা অপরিবর্তিত থাকলে দাম বাড়ার স্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়। চিনি, সার, সিরামিক, টেক্সটাইল, স্টিল, কাচসহ বিভিন্ন গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে খুচরা বাজারেও পৌঁছাতে পারে।
আরেকটি বড় উদ্বেগ কর্মসংস্থান। দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকলে মালিকপক্ষ উৎপাদন ব্যয় কমাতে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কমানো, সাময়িক ছুটি কিংবা কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিতে পারে। এতে বেকারত্ব বাড়ার পাশাপাশি লাখো পরিবারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গ্যাস সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকটেরও সম্পর্ক রয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে লোডশেডিং বাড়তে পারে। এতে শিল্পকারখানার ওপর দ্বিগুণ চাপ তৈরি হবে—একদিকে গ্যাস নেই, অন্যদিকে বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা।
এ পরিস্থিতিতে সিএনজি পরিবহন খাতও বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে। ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকলে যানবাহনকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে গণপরিবহনের সংখ্যা কমে যেতে পারে, যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়তে পারে এবং পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পণ্য পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারদরের ওপরও পড়বে।
গ্যাসের ঘাটতি যদি শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায়, তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। উৎপাদন খরচ বাড়লে উদ্যোক্তারা তা পণ্যের দামে সমন্বয় করার চেষ্টা করবেন। পরিবহন ব্যয় বাড়লে সেই চাপও ভোক্তার ওপর স্থানান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি হলো রপ্তানি খাত। গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো পূরণ করা কঠিন হতে পারে। এতে বিদেশি ক্রেতার আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতেও তখন বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।
দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে পারে। কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগের আগে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে চান। উৎপাদন চালু রাখার জন্য যদি প্রতিনিয়ত জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের শিল্প পরিবেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
এর পাশাপাশি বাড়তে পারে ব্যবসার অনিশ্চয়তা ও উৎপাদন ব্যয়। একটি কারখানা কখন গ্যাস পাবে আর কখন পাবে না—এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদনের পরিকল্পনা করা কঠিন। কাঁচামাল মজুত, শ্রমিক ব্যবস্থাপনা, পণ্য সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এতে ব্যবসার সামগ্রিক দক্ষতা কমে যায়।
গ্যাস সংকট দীর্ঘ হলে বিকল্প জ্বালানির ওপর চাপও বাড়বে। অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি পরিবেশের ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। ছোট ও মাঝারি শিল্পের পক্ষে এই বাড়তি ব্যয় বহন করা আরও কঠিন।
তবে এই সংকটকে কেবল বর্তমান ঘাটতির হিসাব দিয়ে দেখলে চলবে না। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতাও সামনে এনে দিয়েছে। দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে আসছে, অন্যদিকে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম, সরবরাহব্যবস্থা বা আমদানি অবকাঠামোয় কোনো সমস্যা হলে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাও দ্রুত চাপে পড়ে।
তাই এখন প্রয়োজন তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গতি বাড়াতে হবে। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করার পাশাপাশি টার্মিনাল ও সরবরাহ অবকাঠামোর সক্ষমতাও বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে সংকটের সময়ে গ্যাস বণ্টনে অগ্রাধিকারভিত্তিক নীতি প্রয়োজন। আবাসিক গ্রাহক, বিদ্যুৎ উৎপাদন, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প এবং রপ্তানিমুখী শিল্প—কোন খাতে কতটা সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ পরিকল্পনা থাকা দরকার।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, গ্যাস সংকট কেবল একটি জ্বালানি সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাদ্য সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, পরিবহন, মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং মানুষের জীবনযাত্রা। আজ যদি সংকটকে যথাসময়ে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, আগামী দিনে এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য আরও বড় হতে পারে।
সুতরাং গ্যাস সংকটকে সাময়িক দুর্ভোগ হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। সংকট যত দীর্ঘ হবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে। এখনই সমন্বিত, স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়াই পারে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে।