৫ আগস্টের শিক্ষা: গণআকাঙ্ক্ষা অগ্রাহ্য করলে ক্ষমতা টেকে না

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। টানা ৩৬ দিনের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ক্ষমতাসীন সরকারের পতন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ রাষ্ট্র, রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। ঘটনাটির রাজনৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—যখন রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট গভীর হয়, তখন কোনো সরকারই শুধু প্রশাসনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম, সরকারি বিবৃতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য থেকে যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি, আন্দোলনের বিস্তার এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন। পরে ভারতের সংসদেও সে সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বক্তব্য দেওয়া হয়। এসব তথ্য ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত থাকলেও এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—একটি রাষ্ট্র কীভাবে সংকট মোকাবিলা করে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংকটের সময়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের মতামত, রাজনৈতিক সংলাপ এবং জবাবদিহি কখনোই বিকল্পহীন নয়। যখন ভিন্নমত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত হয়, বিরোধী মতকে প্রতিপক্ষ নয় বরং শত্রু হিসেবে দেখা হয় এবং নাগরিকদের অসন্তোষকে সময়মতো গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তখন সংকট আরও জটিল হয়ে ওঠে। ফলে ছোট একটি আন্দোলনও একসময় বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা বজায় রাখা রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম শর্ত। রাজনৈতিক সংকটের সময় এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আত্মসমালোচনারও সুযোগ। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু সহিংসতা নয়; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়; ক্ষমতার পরিবর্তন হবে সাংবিধানিক ও শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায়।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, জনগণের আস্থা হারালে ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই যে সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকুক না কেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা, আইনের শাসন, মানবাধিকার, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি ক্ষমতায় নয়—জনগণের বিশ্বাসে।