সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • দ্বিতীয় স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় এমপি গাজী নজরুলের ৪ দিনের রিমান্ড মারা গেলেন বরেণ্য অভিনেত্রী মিঠু মুখার্জি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প ছিল না: জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইহসান: মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণের ইসলামি শিক্ষা ডেঙ্গু প্রতিরোধে ডিজিটাল সচেতনতা ক্যাম্পেইনের আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ৬ ম্যাচে ৭ গোল, তোরেসকে নিয়ে নতুন ভাবনায় পিএসজি মরিনহোর রেফারিং অভিযোগ, সিমিওনের বার্তা :‘সম্মানের সীমা অতিক্রম করা ঠিক নয়’ ফ্যাসিস্ট আমলে সরকারপ্রধানের বিদেশ সফরে কোটি কোটি টাকা অপচয় হতো: রিজভী জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর সফর, বিশ্বমঞ্চে নতুন ইতিহাসের সূচনা : মাহদী আমিন চট্টগ্রাম বিভাগের ১২ কারাগারে ধারণক্ষমতার আড়াই গুণ বন্দি
  • বিশ্ববাজারে তেল সস্তা, বাংলাদেশে দাম বাড়ে কেন?

    বিশ্ববাজারে তেল সস্তা, বাংলাদেশে দাম বাড়ে কেন?
    ছবি: এআই
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম যখন কমছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে—বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে বাংলাদেশে দাম কমে না কেন, বরং বাড়ে কেন?

    রোববার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে নতুন দাম ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে।

    অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৭১ ডলার এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে নেমেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ সেপ্টেম্বরের পর এই প্রথম ব্রেন্ট ১০২ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ১০০ ডলারের নিচে নেমেছে।

    তাহলে দুই বাজারের এই বিপরীত চিত্রের কারণ কী?

    প্রথমেই বুঝতে হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আর বাংলাদেশের পাম্পে বিক্রি হওয়া জ্বালানি তেলের দাম এক জিনিস নয়। বিশ্ববাজারে যে অপরিশোধিত তেলের দর ওঠানামা করে, সেটি সরাসরি বাংলাদেশের ভোক্তার কাছে বিক্রি করা হয় না। অপরিশোধিত তেল বা পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির পর তার সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন, জাহাজভাড়া, বিমা, পরিশোধন, সংরক্ষণ, ডিলার ও পরিবেশকের কমিশনসহ নানা ব্যয়। এর সঙ্গে রয়েছে কর-শুল্ক, বিনিময় হার এবং অন্যান্য সরকারি ও পরিচালন ব্যয়।

    বাংলাদেশে ২০২৪ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির আওতায় জ্বালানি তেলের দাম পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, আমদানি ব্যয়, কর ও শুল্ক, ডলারের বিনিময় হারসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে খুচরা মূল্য নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

    এখানেই আসে সময়ের ব্যবধানের বিষয়টি। আন্তর্জাতিক বাজারে আজ দাম কমেছে মানেই বাংলাদেশে আমদানি করা প্রতিটি চালানের দাম একই দিনে কমে যাবে—এমন নয়। আগে যে দামে জ্বালানি কেনা হয়েছে, তার চালান আসতে সময় লাগে। ফলে স্থানীয় বাজারের মূল্য নির্ধারণে আগের কয়েকটি সময়ের আন্তর্জাতিক মূল্য, আমদানি ব্যয় ও মজুতের প্রভাব থাকতে পারে।

    আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিময় হার। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি কিনতে হয় ডলারে। ফলে বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম কিছুটা কমলেও ডলারের বিপরীতে টাকার অবস্থান দুর্বল হলে সেই সুবিধার একটি অংশ আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে হারিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যারেলপ্রতি মূল্য দেখলেই বাংলাদেশের প্রকৃত আমদানি ব্যয় বোঝা যায় না।

    এর সঙ্গে রয়েছে কর, শুল্ক ও অন্যান্য নির্ধারিত ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৫ বা ১০ ডলার কমলেও খুচরা বাজারে তার পুরোটা একই অনুপাতে প্রতিফলিত হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ পাম্পে বিক্রি হওয়া এক লিটার জ্বালানির মূল্যের মধ্যে শুধু মূল জ্বালানির দাম থাকে না।

    তবে এখানেই সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে স্বচ্ছতার প্রশ্ন।

    স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির কথা বলা হলে সাধারণ মানুষের জানার অধিকার রয়েছে—কোন সময়ের আন্তর্জাতিক বাজারদর ধরে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, আমদানি ব্যয় কত ধরা হয়েছে, ডলারের কোন বিনিময় হার ব্যবহার করা হয়েছে, কর-শুল্ক ও অন্যান্য খাতে কত টাকা যোগ হয়েছে এবং কোন সূত্রে প্রতি লিটারের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

    বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশে দ্রুত দাম বাড়ানো হবে, কিন্তু দাম কমলে তার প্রভাব স্থানীয় বাজারে দেখা দিতে দীর্ঘ সময় লাগবে—এমন ধারণা তৈরি হলে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। একটি কার্যকর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত হলো, দাম বাড়ার পাশাপাশি কমার সুবিধাও ভোক্তার কাছে যুক্তিসংগত সময়ে পৌঁছানো।

    এখানে আরও একটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া দরকার। বিশ্ববাজারের তেলের দাম প্রতিদিন পরিবর্তিত হয়। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ বাধা, উৎপাদনকারী দেশগুলোর সিদ্ধান্ত এবং বৈশ্বিক চাহিদার ওপর নির্ভর করে তেলের বাজার অত্যন্ত অস্থির। তাই এক দিনের দাম দিয়ে স্থানীয় বাজারের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত নয়। আবার দীর্ঘ সময় ধরে বেশি দামের পুরোনো হিসাব ধরে রাখাও ভোক্তার জন্য ন্যায্য হবে না।

    বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও তেলের বাজারকে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত ঘিরে সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হলে তেলের দামে ঝুঁকিজনিত বাড়তি মূল্য যুক্ত হয়। আবার কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা দেখা দিলে সেই ঝুঁকির মূল্য কমে যেতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম দ্রুত ওঠানামা করা স্বাভাবিক।

    বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি বাস্তবতা হলো—দেশের অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম যুক্ত। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে। কৃষিতে সেচ, শিল্পে উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির প্রভাব রয়েছে। ফলে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি শুধু পাম্পে গাড়ির জ্বালানি খরচ বাড়াবে না; এর পরোক্ষ প্রভাব বাজারের পণ্য ও সেবার ওপরও পড়তে পারে।

    বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব তুলনামূলকভাবে ব্যাপক হতে পারে। বাস, ট্রাক, নৌযান, কৃষিযন্ত্র ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে এর মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও চাপ তৈরি করতে পারে।

    তাই প্রশ্নটি শুধু ‘বিশ্ববাজারে তেল কমেছে, বাংলাদেশে কেন বাড়ল’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবর্তনের কতটা এবং কত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের ভোক্তামূল্যে প্রতিফলিত হচ্ছে?

    সরকার যদি আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, কর-শুল্ক ও অন্যান্য খরচের একটি পরিষ্কার হিসাব প্রকাশ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি অনেকটাই দূর হবে। একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণের সূত্র, পর্যালোচনার সময়সীমা এবং দাম কমলে তার সুফল কীভাবে দ্রুত ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে—সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

    বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেই যে বাংলাদেশে সঙ্গে সঙ্গে দাম কমাতে হবে, অর্থনীতির বাস্তবতা এমন সরল নয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমার পরও যদি দেশের বাজারে দাম বাড়ে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের যুক্তি জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার দায়িত্ব সরকারের রয়েছে।

    কারণ জ্বালানি তেল শুধু একটি পণ্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবহন, কৃষি, শিল্প, বাজারদর এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। তাই জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে শুধু হিসাবের স্বচ্ছতাই নয়, ভোক্তার স্বার্থও সমান গুরুত্ব পাওয়া জরুরি।

    বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে তার বোঝা ভোক্তাকে বহন করতে হবে—এটি যদি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার যুক্তি হয়, তবে বিশ্ববাজারে দাম কমলে সেই স্বস্তিও ভোক্তার কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণের বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত এখানেই।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ