শ্রমিকের অধিকার রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব

পোশাকশ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে সংঘটিত সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি শুধু একটি শিল্পাঞ্চল বা নির্দিষ্ট কয়েকটি কারখানার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, জননিরাপত্তা এবং সামগ্রিক স্থিতিশীলতা জড়িত। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে দাবি আদায়ের নামে সড়ক অবরোধ, সরকারি-বেসরকারি সম্পদে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মিরপুরে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলা উত্তেজনা ও সংঘর্ষে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। সড়ক অবরোধের কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। কর্মস্থলগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া নাগরিকেরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। বিভিন্ন দোকানপাট ভাঙচুরের পাশাপাশি ব্যাংকের কাচ ভাঙা এবং পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি আগুন নিয়ন্ত্রণে আসা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকেও ধাওয়া করার অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনো শ্রমিক আন্দোলনের স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য অংশ হতে পারে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা। সে দায়িত্ব পালনে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংযম, পেশাদারত্ব ও আনুপাতিক শক্তি প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। যারা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা সহিংসতায় জড়িত, তাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানো শ্রমিকদের অধিকার যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপের মধ্যে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা যে কঠিন হয়ে উঠেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের সাফল্যের পেছনে শ্রমিকদের শ্রম, নিষ্ঠা ও অবদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তাঁদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা কেবল শিল্পমালিকদের দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তবে মজুরি নির্ধারণ একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আলোচনাভিত্তিক প্রক্রিয়া। এ ক্ষেত্রে শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিকপক্ষ, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রয়োজন। সরকার মজুরি বোর্ড গঠনসহ যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলোর অগ্রগতি ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে শ্রমিকদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রক্রিয়ায় অসন্তোষ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোলা রাখতে হবে। শ্রমিকদের বক্তব্য শোনা এবং তাঁদের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে কোনো স্বার্থান্বেষী বা গোপন রাজনৈতিক গোষ্ঠী পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে পলাতক আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী শ্রমিকদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে উসকানি, সহিংসতা কিংবা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ইন্ধন জুগিয়েছে কি না, সে বিষয়েও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি ও ক্ষোভকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে কেউ যদি জনসম্পদ ধ্বংস, অগ্নিসংযোগ কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করে, তাদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য উদ্ঘাটন করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তবে প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী না করে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আনাই হবে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। এতে একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনের মর্যাদা রক্ষা পাবে, অন্যদিকে আন্দোলনের আড়ালে নাশকতা বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টাও প্রতিহত করা সম্ভব হবে।
পোশাকশিল্পের সঙ্গে দেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং লাখো মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তাই এই খাতে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব শুধু মালিক বা শ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এবং ক্রেতাদের আস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। শিল্পের স্বার্থ রক্ষার অর্থ শ্রমিকের স্বার্থ উপেক্ষা করা নয়; বরং শ্রমিক ও মালিক, উভয়ের জন্য ন্যায়সংগত ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা।
মিরপুরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর যান চলাচল স্বাভাবিক হওয়া স্বস্তির খবর। কিন্তু শুধু সড়ক খুলে দেওয়া বা সংঘর্ষ থামানোই যথেষ্ট নয়। কেন শ্রমিকদের মধ্যে এমন অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে, তাঁদের দাবির কতটা যৌক্তিক, মজুরি নিয়ে বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি কীভাবে এড়ানো যায় এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দুটি দায়িত্ব পালন করতে হবে; শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জানমাল ও জনসম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো পক্ষের স্বার্থেই অন্য পক্ষের অধিকার বিসর্জন দেওয়া যায় না। শ্রমিকদের দাবি আলোচনার টেবিলে আসুক, মালিকপক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনের সীমার মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করুক।
মনে রাখতে হবে, সহিংসতা কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। দাবি আদায়ের নামে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি কিংবা রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদ ধ্বংসের সুযোগ নেই। আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিও উপেক্ষিত হতে পারে না। ন্যায়বিচার, সংলাপ, দায়িত্বশীলতা ও আইনের শাসনের মধ্য দিয়েই এ সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব। দেশের শিল্প, অর্থনীতি ও জনজীবনের স্বার্থে সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোকে এখনই দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।