আট মাসেই তিন মন্ত্রীর বিদায়, সরকারে জবাবদিহির প্রশ্ন

সরকার গঠনের মাত্র আট মাসের মধ্যে বিএনপি সরকারের তিন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব পদত্যাগের পেছনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ভূমিকা থাকুক না কেন, ঘটনাগুলো সরকারের দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহি ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া এবং সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা একজন জনপ্রতিনিধি ও সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তির আচরণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে কোনো ব্যক্তি বা জনপ্রতিনিধি নিজ উদ্যোগে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন, তার স্পষ্ট সীমারেখা থাকা জরুরি। অপরাধ দমনের দায়িত্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সহযোগিতা করা, নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া নয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পদত্যাগের নির্দেশকে সরকারে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। আইনমন্ত্রীও বলেছেন, মানুষের প্রত্যাশার পরিপন্থী কাজ করলে ব্যক্তি যত ঘনিষ্ঠই হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। এই বক্তব্য বাস্তবে কার্যকর হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পদত্যাগের মধ্য দিয়ে কোনো ঘটনার দায় শেষ হয়ে যায় না; ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই, আইনের প্রয়োগ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হয়।
এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে পদত্যাগ করেন। তবে তাঁর পদত্যাগের পেছনে পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন, চেয়ারম্যান পদে সুপারিশ এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অন্যদিকে, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন মন্ত্রিত্ব ছাড়ার দিনই প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। ফলে তাঁর পদত্যাগকে কেন্দ্র করে মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পুনর্বণ্টন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একইভাবে, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া এবং তাঁর পদত্যাগের পর আসন শূন্য ঘোষণা করার ঘটনাও রাজনৈতিক জবাবদিহির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব ঘটনায় অভিযোগের বিচার ও দায় নির্ধারণ হতে হবে যথাযথ তদন্ত এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায়।
সরকারের প্রথম কয়েক মাসে একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বিদায়কে কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা সাংগঠনিক রদবদল হিসেবে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যাবে না। বরং দেখতে হবে, মন্ত্রিসভায় নিয়োগের আগে যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই কতটা কার্যকর ছিল, দায়িত্ব পালনের সময় নজরদারি কেমন ছিল এবং বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর সরকার কতটা স্বচ্ছভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের পদ কোনো ব্যক্তিগত অধিকার নয়; এটি জনগণের আস্থা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তির আচরণে স্বচ্ছতা, সংযম ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা অপরিহার্য। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে পদ থেকে সরানো কিংবা কোনো অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও জরুরি।
বিএনপি সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, পদত্যাগের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন সংকট হিসেবে না দেখে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জবাবদিহি জোরদারের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো। ব্যক্তির পরিচয় বা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নয়, বরং দায়িত্ব পালনের মানদণ্ডই যেন সিদ্ধান্তের ভিত্তি হয়। কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকলেই সরকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে।