সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • সাত শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি খুলবে না: ইরান মুস্তাফিজের এমন বোলিং অপ্রত্যাশিত, মোসাদ্দেককে ব্যবহার করা উচিত ছিল: সুজন পুলিশে বড় রদবদল, ডিআইজি-এসপি পদমর্যাদার ২৪ কর্মকর্তার নতুন দায়িত্ব ১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল ২৫২ টাকা ডেঙ্গু ও হাম উপসর্গে ৯ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৩ হাজার ৩০৭ নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে নির্বাচনী ব্যয় কমানোর তাগিদ জয়শঙ্করের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ দিল্লিতে রিয়াজ হামিদুল্লাহর বাংলাদেশের ৯২% পণ্যে যুক্তরাজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল থাকবে: সারাহ কুক টোকিওতে বাড়ছে যৌন পর্যটনের অভিযোগ, উদ্বেগে জাপান ভার্চুয়াল যোগাযোগেই কি ভাঙছে দাম্পত্যের বিশ্বাস?
  • সড়কে মৃত্যু যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত না হয়

    সড়কে মৃত্যু যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত না হয়
    ছবি: এআই
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সেপ্টেম্বর মাসে দেশের সড়কগুলোতে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪২৩ জনের প্রাণহানি এবং ৬৭৪ জনের আহত হওয়ার যে চিত্র সামনে এসেছে, তা নিছক একটি মাসের পরিসংখ্যান নয়—এটি দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতারই প্রতিচ্ছবি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব দুর্ঘটনায় ৭৩ জন নারী ও ৬১ জন শিশুও প্রাণ হারিয়েছেন। পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীদের মৃত্যুর হারও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করছে।

    রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মোট নিহতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে ১০৬ জন পথচারীর মৃত্যু দেখিয়ে দিচ্ছে, দেশের সড়কগুলো শুধু চালকদের জন্য নয়, সাধারণ পথচারীদের জন্যও কতটা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

    দুর্ঘটনার বড় একটি অংশ ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। এর পেছনে অতিরিক্ত গতি, চালকের দক্ষতার ঘাটতি, বেপরোয়া মানসিকতা, যানবাহনের ত্রুটি এবং সড়কের অব্যবস্থাপনার মতো কারণ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনাকে শুধু ‘দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য।

    আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুর্ঘটনার ভৌগোলিক বিস্তার। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটলেও দেশের অন্যান্য বিভাগেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রাজধানী ঢাকাতেই সেপ্টেম্বরে ৫২টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন। ব্যস্ত নগরীর সড়কে এমন প্রাণহানি নগর পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে আনে।

    সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি নৌ ও রেলপথেও প্রাণহানি ঘটেছে। সেপ্টেম্বরে ১১টি নৌ দুর্ঘটনায় ১৬ জন এবং ২৩টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত হয়েছেন। ফলে নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টি কেবল সড়ক পরিবহনে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

    প্রতিবছর দুর্ঘটনার পর তদন্ত, পরিসংখ্যান এবং সুপারিশ সামনে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের হার কতটা? মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে কি না, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, মহাসড়কে গতিসীমা কতটা মানা হচ্ছে, ট্রাফিক আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা নিয়মিত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

    বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। তরুণদের বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, হেলমেট ব্যবহারে অনীহা এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রচার নয়, নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। একইভাবে পথচারীদের নিরাপত্তায় ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থা, জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভারব্রিজ ও সিগন্যাল ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।

    চালকদের কর্মঘণ্টা, বেতন ও স্বাস্থ্যগত বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং মানসিক চাপ চালকের মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে চালকদেরও মানবিক কর্মপরিবেশ দিতে হবে।

    তবে দায় শুধু চালকদের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, লাইসেন্স প্রদান, সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগ—প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতন করাও জরুরি।

    সড়ক নিরাপত্তার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার এবং মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য পৃথক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

    সবচেয়ে বড় কথা, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ এবং অসংখ্য মানুষের জীবন জড়িয়ে থাকে। তাই নিরাপদ সড়ক কেবল পরিবহন খাতের দাবি নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।

    সরকার, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ মানুষ—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি নিয়মের কঠোর প্রয়োগ এবং ধারাবাহিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে মাস শেষে নতুন পরিসংখ্যান আসবে, কিন্তু সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামবে না।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ