বাজারের আগুনে সাধারণ মানুষের হিসাব মেলানোই কঠিন

রাজধানীর বাজারে শীতের সবজির আগমন সাধারণত স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে। মৌসুমি সরবরাহ বাড়লে সবজির দাম কিছুটা কমবে—এটাই ক্রেতাদের স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু এবার সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার যেন বড় ফারাক। অধিকাংশ সবজি ৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এর সঙ্গে মাছ, মাংস ও ডিমের বাড়তি দাম যোগ হয়ে নিত্যদিনের বাজার ক্রমেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল একটি দিনের বাজারদরের হিসাব নয়; এটি মানুষের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়েরও প্রতিচ্ছবি। টমেটো, গাজর, বেগুন, শিম, করলা, বরবটি কিংবা কাঁচা মরিচ—প্রায় প্রতিটি পণ্য কিনতেই ক্রেতাকে আগের তুলনায় বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। শীতের সবজি বাজারে আসতে শুরু করলেও তার প্রভাব এখনো দামে দেখা যাচ্ছে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাজারের এই চাপ শুধু নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, সীমিত আয়ের পরিবার—সব শ্রেণির মানুষকেই এখন বাজার করতে গিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তব্যে যখন উঠে আসে যে টিউশনি করেও মাসের খরচ সামলাতে বাড়ি থেকে টাকা আনতে হচ্ছে, তখন বিষয়টি নিছক বাজারদরের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি চাপের ইঙ্গিত দেয়।
ডিমের দাম ডজনে ১০ টাকা বেড়ে যাওয়াও বাজার পরিস্থিতির আরেকটি দিক সামনে এনেছে। মুরগির দাম তুলনামূলক স্থির থাকলেও ডিমের মূল্যবৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে বিক্রেতাদের কাছেও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। ‘বেশি দামে কিনি, তাই বেশি দামে বিক্রি করি’—এই চক্রটি ভোক্তার জন্য কোনো সমাধান নয়। উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত কোথায় অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত হচ্ছে, সেটি খুঁজে বের করা জরুরি।
মাছ-মাংসের বাজারও সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। ইলিশ, চিংড়ি, রুই, কাতল, শিং, টেংরাসহ বিভিন্ন মাছের দাম ক্রেতার সামর্থ্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত দূরত্ব তৈরি করছে। গরু ও খাসির মাংসের দামও অনেক পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকা থেকে এসব পণ্যকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
বাজারে দাম বাড়ার পেছনে উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি, সরবরাহ ব্যবস্থা কিংবা মৌসুমি সংকটের মতো নানা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু কারণ যাই হোক, ভোক্তার ওপর তার পুরো চাপ পড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। উৎপাদক ন্যায্য দাম পাবেন, ব্যবসায়ীও যুক্তিসঙ্গত মুনাফা করবেন—একই সঙ্গে ভোক্তাও যেন সহনীয় দামে পণ্য কিনতে পারেন, সেই ভারসাম্য নিশ্চিত করা দরকার।
এখানে বাজার তদারকির প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অভিযান চালিয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করলেই বাজার স্থিতিশীল হবে না। পণ্যের সরবরাহ, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের মূল্য ব্যবধান, সিন্ডিকেট বা অস্বাভাবিক মজুত এবং পরিবহন ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে তার উৎস থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে শীতের সবজির সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে দাম কমার সম্ভাবনা বাস্তবে নিশ্চিত করতে হবে। মৌসুমি উৎপাদন বাড়লেও যদি মধ্যস্বত্বভোগী বা সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সেই সুফল ভোক্তার কাছে না পৌঁছায়, তাহলে উৎপাদন বৃদ্ধির অর্থনৈতিক সুবিধা সাধারণ মানুষ পাবেন না।
‘দিন যাচ্ছে আর দাম বাড়ছে, হিসাব মেলানোই কষ্ট’—একজন ক্রেতার এই বক্তব্য এখন অনেক পরিবারের বাস্তবতা। মানুষের আয় যদি একই জায়গায় থাকে, কিন্তু খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে জীবনযাত্রার মান স্বাভাবিকভাবেই চাপে পড়ে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণকে শুধু প্রশাসনিক অভিযান হিসেবে না দেখে মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর তদারকি, প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ বাজারের অস্থিরতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সেই সাধারণ মানুষকেই, যার মাসের আয় বাড়ে না, কিন্তু বাজারের খরচ প্রতিদিনই বাড়তে থাকে।