টেন্ডার থেকে বদলি-পদায়ন, গণপূর্তের বদরুল আলমকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা সার্কেল-১-এর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানকে ঘিরে সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার, কাজ বণ্টন, অর্থছাড়, বদলি-পদায়ন ও সম্পদ অর্জনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর পাশাপাশি নারীঘটিত যোগাযোগকে ব্যবহার করে কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের চাপে ফেলা এবং অর্থ দাবির অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে কয়েকজন ঠিকাদার ও গণপূর্তের কর্মকর্তারা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের পর বদরুল আলমকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, ওমরাহ পালনের কথা বলে তিনি ছুটিতে রয়েছেন। তবে এখনো অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রমে বদরুলের ইশারা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গণপূর্তের বিভিন্ন বড় প্রকল্পের দরপত্রে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে বদরুল আলম প্রভাব বিস্তার করেছেন। মিরপুর, সাভার, মানিকগঞ্জ ও গাজীপুরের একাধিক প্রকল্পের নামও এসব অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কুমিল্লার একটি ই/এম টেন্ডারে ভুয়া সার্টিফিকেটধারী এক ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অর্থের প্রভাবে তদন্ত থেমে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঠিকাদারদের একাংশের দাবি, বদরুল আলমকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতে অধস্তন প্রকৌশলীদের ওপরও চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, ‘টাকা ছাড়া কিছুই বুঝেন না প্রকৌশলী বদরুল স্যার। তা ছাড়া নির্ধারিত ঠিকাদার ছাড়া কাজ পাওয়ার সুযোগ নাই।’
নারীঘটিত যোগাযোগকে ব্যবহার করে চাপের অভিযোগ
বদরুল আলমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে নতুন করে সামনে এসেছে নারীঘটিত যোগাযোগের বিষয়টি। কয়েকজন প্রকৌশলীর অভিযোগ, পরিচিত নারীদের মাধ্যমে প্রথমে নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা হতো। পরে সেই যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হলে ব্যক্তিগত বিষয়কে কেন্দ্র করে ভয়ভীতি দেখানো, ব্ল্যাকমেইল এবং অর্থ দাবির মতো ঘটনা ঘটত বলে অভিযোগ তাদের।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদার এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়লে বিষয়টি ‘সমাধান’ করার নামে পরে বদরুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, অভিযোগের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত ফাঁদ তৈরি থেকে শুরু করে তা থেকে বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়াতেও একটি প্রভাবশালী যোগাযোগবলয় কাজ করত।
কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীর অভিযোগ, এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের কাছে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ দাবি করা হয়েছে।
খুলনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম দাবি করেন, ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে এক নারী তাকে ফোন করে বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করেন। ওই নারীর সঙ্গে বদরুল আলমের পরিচয় রয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। পরে বিষয়টি সমাধানের জন্য বদরুল আলম তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলেও দাবি করেন আতিকুল ইসলাম। তাঁর দাবি, এ ঘটনার পর তাকে প্রথমে দায়িত্ব থেকে ক্লোজ করা হয় এবং পরে খুলনায় বদলি করা হয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, এ ধরনের অভিযোগ বিচ্ছিন্ন ঘটনা কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাদের টার্গেট করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তাদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা অথবা বড় ঠিকাদার হওয়ায় বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে বলে তারা মনে করেন।
টেন্ডার ও কাজ বণ্টনে প্রভাবের অভিযোগ
বদরুল আলমের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার, অর্থছাড় ও কাজ বণ্টনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মন্ত্রীদের সরকারি বাংলো দ্রুত মেরামতের কথা বলে টেন্ডার ছাড়াই পরিচিত ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া, প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় দেখিয়ে অর্থ ভাগাভাগি, পছন্দের ঠিকাদারকে বড় প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের মতো ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া প্রকল্পের অর্থছাড়ে অনিয়ম এবং সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সাভার সার্কেলে দায়িত্ব পালনের পর নিজের আস্থাভাজন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেজবুল কবিরকে গাজীপুরে দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে বদরুল আলমের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, হেজবুল কবিরের মাধ্যমে ঠিকাদারদের সঙ্গে বিভিন্ন কাজের সমন্বয় এবং পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে প্রকল্পের কাজ ভাগ করে দেওয়া হতো।
গাজীপুরে বদরুল আলমের দায়িত্ব পালনকালে বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের অভিযোগ, প্রায় ৫ কোটি টাকার কৃষি বিপণন ভবন, ১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকার বিএসটিআই সিভিল, ২০ কোটি ২৪ লাখ টাকার মেট্রোপলিটন সদর থানা, ১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার সদর উপজেলা মডেল মসজিদ, প্রায় ১০ কোটি টাকার কালিয়াকৈর থানা, ১৬ কোটি ২৪ লাখ টাকার পুবাইল থানা এবং প্রায় ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকার কোনাবাড়ী থানা নির্মাণ প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি প্রভাব বিস্তার করেছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব প্রকল্পের টেন্ডার ও কাজ বণ্টনে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে বদরুল আলমের ভূমিকা ছিল। প্রকল্পের কাজ ভাগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
অডিটোরিয়াম নির্মাণেও অনিয়মের অভিযোগ
গাজীপুরের তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটোরিয়াম নির্মাণ নিয়েও বদরুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর নির্দেশনা উপেক্ষা করে অন্য খাতের অর্থ দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, প্রকল্পের ঠিকাদারকে প্রায় ৪ কোটি টাকা অগ্রিম বিল দেওয়া হলেও নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। কাজটি শেষ করতে আরও ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া মিরপুরের পাইকপাড়া আবাসিক প্রকল্প এবং পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের ভাসানটেক থানার কাজেও কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বদলি-পদায়ন ও সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন
বদরুল আলমের বিরুদ্ধে গণপূর্তের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন প্রকৌশলীর দাবি, বিভিন্ন সময়ে তাঁদের ওপর নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে বদরুল আলমের অর্থ লেনদেনের তথ্য-সংবলিত নথি দুদকে জমা পড়েছে বলেও জানা গেছে।
এদিকে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তে উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। এসব অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য তাঁর আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল এবং ব্যাংক লেনদেনসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে অভিযোগকারীদের ভাষ্য।
সরকারি চাকরির পাশাপাশি ডেভেলপার ব্যবসা ও বিভিন্ন সম্পদের মালিকানা নিয়েও বদরুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজধানীর উত্তর বাসাবো, উত্তরা ও বাড্ডায় সম্পত্তি এবং গাজীপুরে জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব সম্পদের কিছু ভাই-বোনের নামে রাখা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তাঁরা।
এর আগে ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনকালে ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগে বদরুল আলমকে ওএসডি করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরও বেশি কাজ গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে করানোর জন্য তহবিল সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক এক প্রধান প্রকৌশলী বলেন, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ই-জিপির পাশাপাশি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ও কর্মদক্ষতা নিরীক্ষা প্রয়োজন। তাঁর মতে, শুধু নিয়ম থাকলেই হবে না, সেগুলোর সমান ও কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি।