বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্মকর্তা শামীম আকতারের দুর্নীতি

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কর্মকর্তা এস এম শামীম আকতারের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, পদমর্যাদার অপব্যবহার, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও নৈতিক স্খলনের একের পর এক আশঙ্কাজনক তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। রাজশাহী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমিতে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর সংঘটিত দুর্নীতির চিত্র গণমাধ্যমে আসার পাশাপাশি সরকারের উচ্চপর্যায়ে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছিল।
দাপ্তরিক নথিসূত্রে জানা যায়, বিগত সরকারের সময়ে বিশেষ রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে তিনি পাঁচবার বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং দীর্ঘ দিন উপপরিচালকের চলতি দায়িত্ব আঁকড়ে রাখেন। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক বড় অঙ্কের আর্থিক তছরুপের প্রমাণ মেলে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বরাদ্দকৃত ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা, বিভিন্ন প্রকল্পের ১৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা বেনামী চেকে উত্তোলন এবং ‘দেশজ সংস্কৃতির বিকাশ’ প্রকল্প থেকে ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা গায়েব করার অভিযোগ রয়েছে।
স্বজনপ্রীতি ও কোটি টাকার সম্পদ: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী একাডেমির পরিচালনা পর্ষদ গঠনে নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে তিনি পছন্দের ব্যক্তিদের বসান। পাশাপাশি শিল্পীদের সম্মানী বকেয়া রাখা, গবেষণার তহবিল আত্মসাৎ এবং নিজের নামে প্রকাশিত একটি বইয়ের মূল লেখকত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তাঁর এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা বেনজামিন টুডু তৎকালিন সভাপতি ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।
সহকারী পরিচালক পদে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও তাঁর অর্জিত সম্পত্তির পরিমাণ অবিশ্বাস্য। নথিপত্র অনুযায়ী, ঢাকায় তিনটি ফ্ল্যাট, দুটি প্লট, কোটি টাকার বেশি এফডিআর (FDR) এবং একটি বিলাসবহুল ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক তিনি। প্রশাসনিক ক্ষমতার পাশাপাশি সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে স্ত্রীকে নির্যাতন ও পরবর্তীকালে জোরপূর্বক তালাক দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, যা রাজনৈতিক প্রভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়।
কর্মস্থলে অনিয়ম ও দাপ্তরিক বিশৃঙ্খলা: আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি শামীম আকতারের বিরুদ্ধে নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার তথ্য রয়েছে। এ কারণে একাডেমির সচিবালয় থেকে তাঁকে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। অবাক করার বিষয় হলো, উপপরিচালকের চলতি দায়িত্বে থেকেও তিনি সহকারী পরিচালকের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতেন—যা চরম দাপ্তরিক বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের শামিল।
রাজনৈতিক আশ্রয়ে পার পেয়ে যাওয়া: ২০১৭ সালে দুর্নীতির দায়ে রাজশাহী থেকে তুলে এনে তাঁকে ঢাকায় সংযুক্ত করা হলেও রাজশাহী-২ আসনের তৎকালীন এমপি ফজলে হোসেন বাদশা এবং তৎকালীন সংস্কৃতিমন্ত্রী কে এম খালিদের সুপারিশে পুনরায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন পান। পরবর্তী সময়ে তিনি গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে বহাল থাকেন।
২০২১ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৯১তম জন্মবার্ষিকীর প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিজয়ীদের প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল তাঁর নিকটাত্মীয় ও অনৈতিক সুবিধাভোগী। এছাড়া এক নারীকে অনৈতিক প্রস্তাব ও হুমকি দেওয়ার ১২ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের একটি কল রেকর্ড ফাঁস হয়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে রূপ বদল: ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শামীম আকতার রাতারাতি খোলস পাল্টানোর চেষ্টা করছেন। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেকে বিএনপি সমর্থক হিসেবে জাহির করতে জোর লবিং চালাচ্ছেন। সিরাজগঞ্জের অধিবাসী হয়েও বগুড়ার পরিচয় ব্যবহার করে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লোটার পাঁয়তারা করছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
অভিযুক্তের বক্তব্য ও রহস্যজনক পদক্ষেপ: অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শামীম আকতার দাবি করেন, এসব পুরনো ঘটনা এবং তিনি তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তবে নির্দোষ হওয়ার প্রশাসনিক কোনো কপি বা প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি।
পরবর্তীতে নিজেকে এক অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিক সংস্থার প্রধান দাবি করে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ফোনে প্রতিবেদককে বলেন, "শামীম আকতার বগুড়ার লোক এবং তিনি উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে নিয়োজিত হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করে তথ্যদাতাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করা উচিত।" তবে আনুষ্ঠানিক লিখিত প্রশ্নের কোনো সদুত্তর শামীম আকতার দেননি।
২০১৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ নথিপত্রে দুর্নীতির স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে বহাল তবিয়তে রয়েছেন, তা নিয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।