বিআইডব্লিউটিএর অতিরিক্ত পরিচালক রহিমের বিরুদ্ধে জাল বিল-ভাউচার ও দুর্নীতির অভিযোগ

পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এবং নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী মাহমুদ চৌধুরীর দোসর হিসেবে পরিচিত বিআইডব্লিউটিএ এর শীর্ষ দুর্নীতিবাজ এবং জাল জালিয়াতির মাস্টার মাইন্ড হিসেবে পরিচিত নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগের বিআইডব্লিউটিএতে এখনো দাপটের সাথে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
এই দুর্নীতিবাজ অতিরিক্ত পরিচালক চাকরিতে বহাল থেকে কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে বিআইডব্লিউটিএর সর্বস্তরে অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছেন। পতিত সরকারের আমলে মোঃ আব্দুর রহিম বিভিন্ন ক্ষমতার দাপট খাটিয়ে জাল-জালিয়াতি এবং ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে তেল খরচের নামে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা অনেকের নামে দুদক এবং বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যানের দপ্তরে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ জমা পড়লেও অদৃশ্য কারণে কোন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রহিমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তিনি দপ্তরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, নারায়ণগঞ্জ নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের উদ্ধারকারী জাহাজ পরিচালনায় জ্বালানি খরচের নামে জাল বিল-ভাউচার তৈরির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একসময় তদন্ত করে। তদন্তে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্রে বিভিন্ন ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া যায় বলেও তারা দাবি করেন।
উদ্ধারকারী জাহাজের তেল খরচ নিয়ে অভিযোগ
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে আগে ‘প্রত্যয়’ ও ‘নির্ভীক’ নামে দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ ছিল। বর্তমানে ‘নির্ভীক’ বরিশাল থেকে পরিচালিত হলেও ‘প্রত্যয়’ নারায়ণগঞ্জ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। শহরের ৫ নম্বর ঘাটসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতে জাহাজটি নোঙর করা থাকে।
অভিযোগ রয়েছে, উদ্ধারকারী জাহাজটির জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব দেখিয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়েছে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
ঠিকাদারি কাজ নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বয়া ও বিকন বাতিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে কয়েকটি কাজের বিপরীতে নির্দিষ্ট অঙ্কের বিলের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘আখি এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে টিপি-১৩৫ বাবদ ৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা, ‘তানিয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে এমপি-১২ বাবদ ৬ লাখ ৮১ হাজার টাকা, ‘তানজিল ডক ইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস’-এর নামে টিপি-৮০ বাবদ ৭ লাখ ১৩ হাজার ৩৫২ টাকা এবং টিপি-১৭৩ বাবদ ৯ লাখ ৩৬ হাজার টাকার বিলের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ‘তানিয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে স্পিডবোট-১ মেরামতের জন্য ৮ লাখ ৮৪ হাজার ১০০ টাকা এবং ‘আলিফ এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে টিপি-৪৫ বাবদ ৪ লাখ ৯৮ হাজার ১৫১ টাকার বিল নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় মো. রহিম রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। উত্তর মুগদা, ঝিলপাড় রোড, মোহাম্মদপুর, সাভার, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট, জমি, দোকান ও ভবন থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় একটি ডকইয়ার্ডে যৌথ মালিকানা এবং পাবনা এলাকায় সম্পদ কেনার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব সম্পদের বৈধ উৎস ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
তদন্তের দাবি
বিআইডব্লিউটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দপ্তরের অভ্যন্তরে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিআইডব্লিউটিএর নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রহিমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।