বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • সাংবাদিক এইচ আর শফিক গ্রেফতার, মুক্তির দাবিতে নিন্দার ঝড় সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে বিএনপিকে চরম মূল্য দিতে হবে: সারজিস বাজুসের নতুন মূল্যতালিকা, সোনা-রুপার গহনার দাম বাড়ল সিজেপির আন্দোলনে অচল দিল্লি, বন্ধ ১৬ মেট্রো স্টেশন থার্ড টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে ভিডিও ইস্যুতে উত্তাল শ্যামনগর, এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বাংলাদেশ-চীন বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, করিডোর ও বিনিয়োগে গুরুত্ব ইউপি চেয়ারম্যান পদে স্নাতক যোগ্যতা চেয়ে হাইকোর্টের রুল জিম্বাবুয়ে সফর শেষে দেশে ফিরল বাংলাদেশ, এবার লক্ষ্য অস্ট্রেলিয়া সৌদির সঙ্গে ৩০ বছরের পরমাণু চুক্তিতে ট্রাম্পের অনুমোদন
  • বরখাস্ত না করে নওগাঁয় বদলিতে ক্ষোভ

    শিল্পকলা একাডেমির সেই জিএম জাকিরের বিরুদ্ধে পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ

    শিল্পকলা একাডেমির সেই জিএম জাকিরের বিরুদ্ধে পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে বিগত কয়েক বছর ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী ও দুর্নীতির অন্যতম হোতা হিসেবে পরিচিত প্রশাসন বিভাগের সাবেক উপপরিচালক জিএম জাকির হোসেনের একের পর এক চাঞ্চল্যকর অপকর্মের তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে। সাবেক স্বৈরাচারী মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তৎকালীন রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি জাতীয় এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তিগত দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছিলেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

    ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, বদলি-পদোন্নতি বাণিজ্য এবং নারী সহকর্মী ও শিল্পীদের হেনস্তা করার মতো নানা অভিযোগ এখন প্রকাশ্যে। সর্বশেষ গত ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে সংস্কৃতি কর্মী উজ্জ্বল পারভেজের লিখিত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ জুলাই তাকে শাস্তিমূলক বরখাস্ত না করে কেবল নওগাঁয় বদলি করায় সাধারণ শিল্পী ও কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

    অফিস কক্ষে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নৈতিক স্খলনঃ
    অভিযোগ রয়েছে, জাকির হোসেন প্রশাসন বিভাগে নিজের দাপ্তরিক কক্ষটিকে ব্যক্তিগত গান শেখানোর কোচিং সেন্টারে রূপান্তর করেছিলেন। সেখানে টিউশন করানোর আড়ালে তিনি বিভিন্ন নারীদের অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন। সম্প্রতি এক নারী শিল্পীকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে আপত্তিকর কুপ্রস্তাব দেওয়ায় কার্যালয়ের ভেতরেই তাকে জনসম্মুখে জুতা ও চড়-থাপ্পড় মারার ঘটনা ঘটে, যা একাডেমি প্রাঙ্গণে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। কোনো নারী এসব অনৈতিক আচরণের প্রতিবাদ করলে জাকিরের শক্তিশালী সিন্ডিকেট তাকে ভয়ভীতি ও মিথ্যা মামলার হুমকি দিতো। এমনকি নিজের কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা ও অডিও রেকডিংয়ের মাধ্যমে নারী শিল্পীদের ফাঁদে ফেলার অপচেষ্টাও চালাতেন তিনি।

    শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও স্টুডিওর মালামাল আত্মসাৎঃ
    দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে জেঁকে বসার সুবাদে ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষের মাধ্যমে জিএম জাকির বর্তমানে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক বনে গেছেন। রাজধানীর আজিমপুরে ১টি ব্যক্তিগত বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, আগারগাঁও ৬০ ফিট এলাকায় একটি ৫ তলা ভবন এবং পূর্বাচলে প্লটসহ তার নামে-বেনামে দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি রয়েছে। এছাড়া তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার এফডিআর (FDR) ও সঞ্চয়পত্র থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, একাডেমির কোটি টাকা মূল্যের একটি স্টুডিওর মূল্যবান মালামাল আত্মসাৎ করে নিজের ব্যক্তিগত অফিস ও বাসভবনে ব্যবহার করার মতো গুরুতর চুরির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

    ৩০ কোটি টাকা লোপাটের চেষ্টা ও চেক জালিয়াতিঃ
    তৎকালীন এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সূত্রে জানা গেছে, জিএম জাকির হোসেন কোনো প্রকার অনুষ্ঠান আয়োজন ছাড়াই একাডেমির তহবিল থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে গায়েব করার নীল নকশা করেছিলেন। তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই অনৈতিক ফাইলে স্বাক্ষর করতে রাজি না হওয়ায় তাকে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়। এছাড়া শিল্পীদের নামে বরাদ্দকৃত চেকের টাকা তিনি নিজেই জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে। সাবেক মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর মেয়াদে ১০০টি সিডি তৈরির নামে ৩৩ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে সেই অর্থ দিয়ে ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগও রয়েছে তার নামে।

    বদলি-পদোন্নতির কোটি টাকার সিন্ডিকেটঃ
    শিল্পকলা একাডেমিতে জাকির হোসেন এক বিশাল অপরাধচক্র গড়ে তুলেছিলেন। তার এই সিন্ডিকেটের প্রধান সহযোগী হিসেবে নাম এসেছে— একাডেমির সচিবের পিএস সুমন মিয়া, তার স্ত্রী তথা অফিস সুপার আসমা বেগম, সাবেক উপপরিচালক (অর্থ) সরকার জিয়াউদ্দিন আহমেদ বিপ্লব এবং প্রশাসন বিভাগের কষ্টিউম ডিজাইনার কামরুন্নাহার সৃষ্টি (বর্তমানে প্রশিক্ষণ বিভাগের কোর্স কো-অর্ডিনেটর)। এই চক্রের মাধ্যমে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো। এমনকি তদন্ত কমিটির সদস্য থাকাকালীন অর্থের বিনিময়ে অপরাধী কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দিয়ে তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চতুর এই কর্মকর্তা নিজেকে ‘জাতীয়তাবাদী দলের’ লোক দাবি করে বর্তমানে ভোল পাল্টানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।

    শাস্তির বদলে বদলি: ক্ষুব্ধ সাংস্কৃতিক মহলঃ
    জাকিরের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অপরাধের প্রমাণ ও অভিযোগ থাকার পরও তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল ঢাকার বাইরে নওগাঁয় বদলি করায় ক্ষোভের ঝড় উঠেছে সাংস্কৃতিক মহলে। গত ৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে এক অফিস আদেশের মাধ্যমে তাকে এই বদলি করা হয়।

    এই বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন,"অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করে তাকে বদলি করেছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে যে সুপারিশ করবে, আমরা ভবিষ্যতে সেই অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।"

    জাতীয় পর্যায়ের এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এই ‘দুর্নীতিবাজ’ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংস্কৃতি কর্মীরা। একই সাথে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নিবিড় তদন্ত করে তার বিপুল অবৈধ সম্পদের রহস্য উন্মোচন ও তাকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সকলে।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন