‘সুলতান সিন্ডিকেট’ ও ‘মিস্টার ৫%’ রবিউলকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-তে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, টেন্ডার সিন্ডিকেট, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য এবং মেগা প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী একটি দুর্নীতির নেটওয়ার্ক—এমন অভিযোগ উঠেছে সংস্থাটির বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সুলতান আহমেদ খান এবং মেরিন বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলামকে ঘিরে রয়েছে শত কোটি টাকার অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিস্তর অভিযোগ।
এদিকে এসব অভিযোগের কয়েকটি বিষয় ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
হত্যা মামলার আসামি হয়েও প্রভাবশালী?
অভিযোগ রয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় রাজধানীর ভাটারা থানায় আসামি হওয়া সত্ত্বেও এখনো গ্রেপ্তার এড়িয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সুলতান আহমেদ খান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মামলা থেকে রেহাই পেতে তিনি প্রায় ৫ কোটি টাকার তদবির তহবিল গঠন করেছেন এবং বিভিন্ন মহলে নিজেকে "সৎ কর্মকর্তা" ও "বিএনপি-ঘনিষ্ঠ" পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
আওয়ামী আমলে গড়ে ওঠা 'সুলতান সাম্রাজ্য'
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতার আত্মীয় পরিচয়ে বিআইডব্লিউটিএতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন সুলতান আহমেদ খান। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার, ড্রেজিং প্রকল্প এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তার অনুমোদন ছাড়া কিছুই হতো না।
গত বছরের ২ অক্টোবর তাকে বিআইডব্লিউটিএ থেকে প্রত্যাহার করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে পাঠানো হলেও তার অনুসারীদের মাধ্যমে এখনো সংস্থায় প্রভাব বজায় রয়েছে বলে দাবি একাধিক কর্মকর্তার।
পাবনা ও কুষ্টিয়ার নদী খনন প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক থাকাকালে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে সুলতান আহমেদ খানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, নদী খননের মাটি বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং সরকারি রাজস্ব যথাযথভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হয়েও ভুয়া সনদের মাধ্যমে পদোন্নতি নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জুনিয়র অফিসার থেকে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক
অন্যদিকে, ২০০১ সালে জুনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করা মো. রবিউল ইসলাম বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএর মেরিন বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারি চাকরির দুই দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই তিনি নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অফিসের ভেতরে রবিউল ইসলাম "মিস্টার ৫%" নামে পরিচিত। তাদের দাবি, ছোট প্রকল্পে ২ শতাংশ এবং বড় প্রকল্পে ৫ শতাংশ কমিশন ছাড়া কোনো ফাইল অনুমোদন করেন না তিনি। এক কর্মকর্তা বলেন, কমিশন ছাড়া কোনো প্রকল্পই এগোয় না। এটাই তার অলিখিত নিয়ম।
'২০ ড্রেজার প্রকল্পে' ২০ কোটি টাকার অনিয়ম
সংস্থার বহুল আলোচিত ২০ ড্রেজার প্রকল্প থেকে অন্তত ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে। এছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের খালাতো ভাইয়ের মালিকানাধীন 'অলি এন্টারপ্রাইজ' নামের প্রতিষ্ঠানকে নিয়মবহির্ভূতভাবে তালিকাভুক্ত করে একের পর এক সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সম্পদের পাহাড়
অনুসন্ধানে অভিযোগ হিসেবে উঠে এসেছে রাজধানীতে স্ত্রী ও আত্মীয়দের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট, ঝিনাইদহে বিপুল পরিমাণ জমি, একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি, বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন, বিভিন্ন ব্যবসায় বেনামী বিনিয়োগ। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তার স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান সম্পদও রয়েছে।
৭ কোটি টাকার 'ভাইরাল মসজিদ'
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার খাজুরা গ্রামে রবিউল ইসলামের অর্থায়নে নির্মিত 'বায়তুল মামুর জামে মসজিদ' নিয়েও এলাকায় ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাঁচতলা এই মসজিদটি দেখতে অনেকটা বিলাসবহুল প্রাসাদের মতো। গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, একজন সরকারি চাকরিজীবী কীভাবে এত অর্থ ব্যয় করতে পারেন, সেটাই মানুষের প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ ও মামলা রয়েছে।
অন্যদিকে সুলতান আহমেদ খানের বিরুদ্ধেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক।
বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান বলেন, সুলতান আহমেদ খানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সুলতান আহমেদ খান ও প্রধান প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।