ঢাকাতেই বহাল সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল, হাজার কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্য, ঘুষ লেনদেন, প্রভাব খাটিয়ে পদায়ন এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা থেকে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রাজধানীর আফতাব নগরে একটি ভবনে ২৯টি ফ্ল্যাটের মালিকানা, ঢাকার অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষিজমি, মাছের ঘের ও খামারের তথ্যও সামনে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তাঁর বদলির আদেশ দেওয়া হয়। তবে পূর্বে ঢাকার পার্শ্ববর্তী টঙ্গী এলাকার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়ন পান তিনি। একের পর এক অভিযোগের পরও রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় তাঁর কর্মস্থল ধরে রাখা নিয়ে রেজিস্ট্রেশন সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
আফতাব নগরে ২৯টি ফ্ল্যাটের অভিযোগ
সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর আফতাব নগরের একটি ভবনে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর ২৯টি ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আনুমানিক মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া গুলশান-১-এর ৭ নম্বর রোডের ৭ নম্বর কোহিনুর টাওয়ারে তাঁর বর্তমান আবাসস্থল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে দুটি ফ্লোরজুড়ে ডুপ্লেক্স বাসভবন রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই এলাকার গ্রিন ভিউ অ্যাপার্টমেন্টে ২ হাজার ৫০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য ১২ কোটি টাকার বেশি।
গুলশান-১-এর ৩৩ নম্বর রোডের ৬ নম্বর বাড়িতে প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের দুটি ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া গুলশানের নর্থ অ্যাভিনিউয়ের ৪০/২ নম্বর ঠিকানায় তিনটি ফ্ল্যাটের নির্মাণকাজ চলমান বলে জানা গেছে।
নিকেতনের এ/১৩৩ নম্বর, ব্লক-এ, রোড-৩-এ প্রায় ১ হাজার ৮০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট এবং হাতিরঝিলের কাছে ৪৮/এ নম্বর ঠিকানায় প্রায় ১ হাজার ৫৫০ বর্গফুটের আরেকটি ফ্ল্যাটের তথ্যও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ফ্ল্যাটটি তাঁর শ্যালকের নামে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর স্ত্রী জান্নাত নীলার নামে জমি ও প্লট, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ধানমন্ডি, গুলশান ও নিকুঞ্জসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট ও জমি থাকার অভিযোগ রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি ও খামার
অভিযোগ অনুযায়ী, মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের খাসনগর পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ১০০ বিঘা কৃষিজমি রয়েছে। এ ছাড়া লাহিড়ী, রসুল্লাবাদ ও নবীনগর এলাকায় প্রায় ৩০ বিঘা কৃষিজমি, মাছের ঘের ও খামারের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
নিজ গ্রাম খাল্লা, বাড্ডা, সলিমগঞ্জ ও মাঝিয়ারার জীবননগর এলাকায় প্রায় ২০ একর কৃষিজমি, মাছের ঘের ও খামার থাকার অভিযোগও রয়েছে।
বদলি-বাণিজ্যে শত কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ
মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনের বদলিতে জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছিল। পছন্দের কর্মস্থলে অবস্থান ধরে রাখতে মাসিক প্রায় ২০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নন-ক্যাডার থেকে সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পাওয়ার পর রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেন। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে বদলি-বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।
মাইকেলের বোন আসমাউল হুসনা লিজার প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। দাবি করা হয়েছে, তৎকালীন নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় শর্ত ও সুপারিশের ব্যত্যয় ঘটেছিল।
তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
অনুসন্ধানে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ২০ থেকে ৩০ জনের একটি প্রভাবশালী দল গড়ে তোলার অভিযোগ করা হয়েছে। ওই দলের মাধ্যমে কমপ্লেক্সের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার এবং প্রতিদিন পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া একটি জাতীয় দৈনিকে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশের পর মধ্যরাতে একদল লোক নিয়ে পত্রিকাটির কার্যালয়ে গিয়ে সংবাদ প্রত্যাহারের চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
জমি নিবন্ধনে ঘুষ ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ
খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে বন্দর স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মালিকানাধীন ৮১ শতাংশ জমি আবাসন প্রতিষ্ঠান শেলটেক প্রাইভেট লিমিটেডের কাছে ৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকায় হস্তান্তরের একটি দলিল নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে দলিল নম্বর ২৫০৯ এবং নিবন্ধনের তারিখ ১০ মার্চ ২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে। ‘শেলটেক লিগ্যাসি প্লাজা’ নির্মাণের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত এ দলিলের আগের রাতে মাইকেলের ঘনিষ্ঠ এক উমেদারের নিকেতনের বাসায় দুই কোটি টাকা ঘুষ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় সরকারি রাজস্ব, স্ট্যাম্প শুল্ক ও নিবন্ধন ফি ফাঁকির অভিযোগও তোলা হয়েছে।
দুদকে অভিযোগ, তদন্তের দাবি
মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্য ও বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। গত ১৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাফসান আল আলভী দুদক চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ দাখিল করেন। এতে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি-পদায়নকে কেন্দ্র করে শত শত কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর সম্পদের উৎস, আয়কর বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল এবং আত্মীয়স্বজনের নামে থাকা সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা তদন্তের দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বক্তব্য জানতে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।