জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের নতুন উদ্যোগ

গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন, তিন থেকে চারটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পুঁজিবাজারে বিশেষ তহবিল গঠন এবং রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি) আয়োজিত ‘টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: বাংলাদেশে বিনিয়োগের চালিকাশক্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব পরিকল্পনার কথা জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাত অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের অনিয়ম এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো সমস্যা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং এলএনজি আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রাজস্ব প্রশাসন, ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারে সংস্কারের মাধ্যমে ব্যবসার ব্যয় কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর ছাড় ও প্রণোদনা
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। বাসাবাড়ি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এসব ব্যবস্থায় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রচলিত দরের চেয়ে বেশি দামে কেনার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সরকারের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে। একই সঙ্গে স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে, যাতে দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো যায়।
খনন করা হবে ১৫০টি গ্যাসকূপ
গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানিকে (বাপেক্স) শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, চুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধান কার্যক্রমের পাশাপাশি বাপেক্সের মাধ্যমে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তিন থেকে চারটি নতুন ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা যুক্ত হচ্ছেন বলে জানান মন্ত্রী।
এ ছাড়া মাতারবাড়ীর পাশাপাশি খুলনার কাছাকাছি গভীর পানির একটি নতুন স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ২০ মিটার গভীরতায় বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল ও এলএনজি খালাসের সুবিধাসম্পন্ন আধুনিক টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত জ্বালানি কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাজস্ব প্রশাসন ও ব্যাংক খাতে সংস্কার
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরাতে রাজস্ব প্রশাসন পুনর্গঠনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নীতি প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়ন—এই দুই ভাগে বিভক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নীতিনির্ধারণে স্বার্থের সংঘাত কমানো এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারে সংস্কারের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ শিথিল করে বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর ফলে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
হংকংয়ের পুঁজিবাজারে বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হংকংয়ের পুঁজিবাজারে বাংলাদেশকেন্দ্রিক বিশেষ শেয়ারভিত্তিক বিনিয়োগ তহবিল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও বন্ড খাতে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আসবে বলে সরকার আশা করছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাত স্থিতিশীল হবে বলে তিনি আশাবাদী। এরপর অর্থনীতি স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে এবং ধীরে ধীরে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।
আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন শেভরন বাংলাদেশের সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের প্রশাসক ফজলুল হক।
এ ছাড়া ফিকির প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।