বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.২ শতাংশ করল আইএমএফ

চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সময়ে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলন চলাকালে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে নতুন এই প্রাক্কলন তুলে ধরা হয়।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল আইএমএফ। নতুন হিসাব অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়েছে সংস্থাটি।
এর আগে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এপ্রিলে সংস্থাটি এই হার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হবে বলে ধারণা করেছিল। অন্যদিকে, গত সেপ্টেম্বরে এডিবি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে।
আইএমএফের প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। এর আগের অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ১০ শতাংশ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তার আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস তুলনামূলকভাবে কম। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারতে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ভুটানের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে।
এ ছাড়া মালদ্বীপের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৮ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। দেশ দুটিতে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮ ও ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
এই পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার উল্লেখযোগ্য অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে কম এবং মূল্যস্ফীতির হার সবচেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনৈতিক গতি কমার কারণ
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং সরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপ্রতুলতার কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণের চাপ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালের জুনে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজস্বসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের জটিলতার কারণে সরকারি বিনিয়োগও চাপে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছানোর পর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে বলে প্রত্যাশা থাকলেও প্রবৃদ্ধির গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে।