রাজস্ব বাড়ানো ও ঋণ স্থিতিশীলতায় জাম্বিয়ার নতুন কর্মসূচিতে আইএমএফের সম্মতি

জাম্বিয়ার জন্য ১৪৭ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও দেশটির সরকার। ৩৬ মাস মেয়াদি এই কর্মসূচির লক্ষ্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি জোরদার করা।
আইএমএফের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবিত ঋণ কর্মসূচির আওতায় ১ হাজার ৭৬ কোটি এসডিআর বা স্পেশাল ড্রয়িং রাইটসের সমপরিমাণ অর্থ দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সংস্থাটির নির্বাহী পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন। পাশাপাশি সম্মত শর্তগুলোর প্রাথমিক বাস্তবায়নও অনুমোদনের পূর্বশর্ত।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকায় অবস্থান করে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল। দলটির নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির কর্মকর্তা এডওয়ার্ড জেমায়েল। সফরকালে জাম্বিয়া সরকারের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়।
আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগের ঋণ কর্মসূচির আওতায় নেওয়া পদক্ষেপের ফলে জাম্বিয়ার অর্থনীতি আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৬ সালে দেশটির প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন, খনি খাতের কার্যক্রম ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাম্বিয়ার মূল্যস্ফীতি কমে ৬ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রয়েছে। একই মাসে দেশটির মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৬ দশমিক ১ বিলিয়ন বা ৬১০ কোটি মার্কিন ডলার।
তবে অর্থনৈতিক অগ্রগতির মধ্যেও ২০২৬ সালে জাম্বিয়ার সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ বেড়েছে। প্রত্যাশার তুলনায় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) থেকে কম রাজস্ব আদায় এবং জ্বালানি কর কমে যাওয়ায় সরকারের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে খাদ্য মজুত সংস্থার (এফআরএ) বাজেটের তুলনায় বেশি ব্যয়ের কারণে সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে ২০২৫ সালের তুলনায় প্রাথমিক রাজস্ব-ব্যয়ের ভারসাম্য দুর্বল হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সাময়িকভাবে দেওয়া জ্বালানি কর-ছাড় প্রত্যাহার এবং অগ্রাধিকারবহির্ভূত উন্নয়ন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে সরকারি বকেয়া জমতে না দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আইএমএফের প্রস্তাবিত কর্মসূচিতে রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সাল থেকে ধাপে ধাপে প্রাথমিক বাজেট উদ্বৃত্ত বাড়িয়ে ২০২৯ সালের মধ্যে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য কর আদায় ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর পরিপালন জোরদার এবং কর অব্যাহতি পুনর্বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
কর্মসূচিতে সরকারি আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে নজরদারি বাড়ানো এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রকল্পগুলোর দায়দায়িত্ব আরও স্বচ্ছ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বকেয়া ও ভ্যাট ফেরতসংক্রান্ত বকেয়া পরিশোধের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক খাত ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়ক ব্যয় সুরক্ষিত রাখার কথা জানিয়েছে আইএমএফ।
মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাম্বিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সুদের হার ও অন্যান্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং বিনিময় হারের ওঠানামা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ও কর্মসূচিতে রয়েছে।
এ ছাড়া জাম্বিয়ার অর্থনীতিকে বহুমুখী করা, রপ্তানিমুখী বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কাঠামোগত সংস্কারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। খনি খাতে লাইসেন্স প্রদান ও প্রকৃত মালিকানা প্রকাশে স্বচ্ছতা বাড়ানো, দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দেশটির জ্বালানি পরিবহন অবকাঠামো তাজামা পাইপলাইনে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও সংস্কার পরিকল্পনায় রয়েছে।
আইএমএফ জানিয়েছে, জাম্বিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা গঠনমূলক হয়েছে এবং সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকারকে তারা স্বাগত জানায়। সফরকালে প্রতিনিধিদলটি জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হাকাইন্দে হিচিলেমা, অর্থ ও জাতীয় পরিকল্পনামন্ত্রী সিতুম্বেকো মুসোকোতওয়ানে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ডেনি কালিয়ালিয়া, সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠক করে।