ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অগ্রগতি ও ক্যাপাসিটি চার্জের হিসাব চায় সংসদীয় কমিটি

বিদ্যুৎ খাতে দেওয়া ২ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জের ফরেনসিক অডিট, ডিজেলের মজুত বাড়ানো এবং এলপিজির বাজারে নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। একই সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অগ্রগতি, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় নিয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
শনিবার (১০ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির প্রথম বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে জাতীয় গ্রিডে কত বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে, তার বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী বৈঠকে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিটি। সদস্যদের উত্থাপিত প্রশ্নের লিখিত উত্তরও পরবর্তী বৈঠকে দিতে বলা হয়েছে।
বৈঠকে জানানো হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বিদ্যুৎ বিভাগের ৪১টি চলমান উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রকল্প সাহায্য ১০ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, সরকারি অর্থায়ন ৪ হাজার ৭১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৩ হাজার ৩৮১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রকৃত উৎপাদনের তথ্য তুলে ধরে বৈঠকে জানানো হয়, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ২২ মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত উৎপাদন ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৬ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট, উৎপাদন ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। আর তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৬ হাজার ৪০৯ মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট।
বৈঠকে আরও জানানো হয়, ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনকারী গ্রাহকেরা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন।
কমিটির সভাপতি মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর সভাপতিত্বে বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, রফিকুল ইসলাম হিলালী, এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, নায়াব ইউসুফ আহমেদ, মমতাজ আলো, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, মো. আবুল হাসনাতসহ অন্য সদস্যরা অংশ নেন।
বৈঠক শেষে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপনায় দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও পরিকল্পনার ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জের ব্যয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে আগের তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
নাজিবুর রহমান বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের পর একজন বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ এবং সেগুলো বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে পরবর্তী বৈঠকে জানাতে বলা হয়েছে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কর্মকর্তারা প্রতিদিন দুই মেগাওয়াট করে সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা জানালেও এ দাবির পক্ষে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। আগামী বৈঠকে এ বিষয়ে তথ্য দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী।
জ্বালানির দাম নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) প্রবিধান প্রণয়ন না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ২০০৩ সালের আইনের ৩৪ ধারায় গণশুনানির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নির্ধারণ এবং এ জন্য প্রবিধান তৈরির বিধান রয়েছে। কিন্তু ২৩ বছরেও তা কার্যকর হয়নি। প্রবিধানের খসড়া তৈরি হলেও সেটি অনুমোদন না হওয়ার কারণ সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি। এলপিজির দাম নির্ধারণ এবং সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে গণশুনানি হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও তুলেছে কমিটি।
নাজিবুর রহমান আরও বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করছে। সংকটকে ব্যবসায়িক সুযোগ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ এবং উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে তিনি বলেন, ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা থাকলেও আগামী ছয় মাস, এক বছর বা দুই বছরের মধ্যে কোন কূপ থেকে গ্যাস পাওয়া সম্ভব, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়নি। নতুন রিগ কেনার পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনার সক্ষমতা এবং সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানের অগ্রগতির তথ্যও চেয়েছে কমিটি।
এদিকে সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৪ হাজার ১২৫ মেগাওয়াট। অথচ এ পর্যন্ত ২ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের অধীনে হওয়া ব্যয়ের ফরেনসিক অডিট প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতার ভিত্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা উচিত। সক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যয়, ভর্তুকি ও ওভারহোলিং চার্জ অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জ কেন দিতে হচ্ছে এবং এ ধরনের ব্যয় কমাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে কমিটি।
ডিজেলের মজুত মাত্র ৩১ দিনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রামীণ কৃষি, যোগাযোগ ও অর্থনীতি ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে গ্রামীণ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ডিজেলের মজুত কীভাবে বাড়ানো যায়, তা জানতে চেয়েছে কমিটি।
এলপিজির বাজারে সরকারের নজরদারির অভাবের অভিযোগ করে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, সরকার নির্ধারিত দাম প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা হলেও বাজারে একটি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। তাঁর অভিযোগ, নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারদরের বড় ব্যবধান থাকলেও কার্যকর নজরদারি নেই।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে এ খাত থেকে জাতীয় গ্রিডে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ দিনে যুক্ত হয়েছে মাত্র ৬০ মেগাওয়াট। এই হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অগ্রগতি কম বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ জন্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাসিক অগ্রগতি এবং সৌর প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানির জন্য খোলা ঋণপত্রের (এলসি) হিসাব চেয়েছে কমিটি। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। তাঁর দাবি, ৫০ মেগাওয়াটের একটি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে আনুমানিক ১৫০ কোটি টাকা খরচ হওয়ার কথা থাকলেও মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকার বেশি। পরবর্তী বৈঠকে প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব দিতে বলা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে মহেশখালী ও পায়রায় নতুন এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ২০৩০ সালের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, সর্বোচ্চ চাহিদা, গ্যাস, কয়লা, সৌর ও পারমাণবিক বিদ্যুতের সম্ভাব্য অনুপাত এবং অলস তেলভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধের সময়সীমা জানতে চেয়েছে কমিটি।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি আহরণ বাড়াতে হবে। অল্প সময়ে ৩২টি কূপ খননের বিষয়ে প্রচারিত তথ্যের ব্যাখ্যা চেয়ে তিনি বলেন, কোনগুলো অনুসন্ধান কূপ আর কোনগুলো উন্নয়ন কূপ, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
অতিরিক্ত ও ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের বিষয়টিও বৈঠকে তোলা হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো কোনো গ্রাহকের নামে ৩ কোটি থেকে ৭ কোটি টাকা পর্যন্ত বিল এসেছে। এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন না বলে অভিযোগ করেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, সংসদীয় কমিটিগুলো যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করে জনগণের স্বার্থে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পরবর্তী বৈঠকের আগে সদস্যরা তাঁদের প্রশ্নগুলো মন্ত্রণালয়কে জানাবেন, যাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে উপস্থিত হতে পারেন।