গোপালগঞ্জে আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নিয়োগে বড় অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠন

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার শেখ আব্দুর রাজ্জাক আলিম মাদ্রাসার সাময়িক বরখাস্ত অধ্যক্ষ মাওলানা সাইফুল ইসলামের নিয়োগ ও নিয়োগ বৈধকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০০২ সালে তাঁর নিয়োগ বৈধ করার ক্ষেত্রে তৎকালীন বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না এবং এ-সংক্রান্ত মূল নথি কোথায়—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি শেখ নাজিম উদ্দিন।
এদিকে নৈতিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, দায়িত্বে অবহেলা ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে সাইফুল ইসলামকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁর পরিবর্তে মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মাওলানা জাহিদুর রহমান মুন্সিকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত করতে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
মাদ্রাসা সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ জানুয়ারি জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে মাদ্রাসা চলাকালে শিক্ষার্থীদের পোশাক পরা অবস্থায় বাইরে নিয়ে গিয়ে মোসাম্মাৎ বেবী বেগম (৫০) ও তাঁর মেয়ে বন্যা মৃধার (২১) ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। ঘটনার সময় ভুক্তভোগী নারী ভিডিও ধারণ করেন। পরে তিনি মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
এ ঘটনায় মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও দাখিল পরীক্ষার্থী মো. রাসেল মাতুব্বরের বাবা হেমায়েত মাতুব্বরও বিচার চেয়ে সভাপতির কাছে অভিযোগ করেন। এ ছাড়া একজন শিক্ষার্থীও ঘটনার বিষয়ে সভাপতির কাছে বিস্তারিত জানিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ মার্চ পরিচালনা কমিটির এক জরুরি সভায় সভাপতি শেখ নাজিম উদ্দিন অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলামকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে তিনি জবাব দিলেও তা সন্তোষজনক মনে করেনি পরিচালনা কমিটি। পরে সভাপতি স্বাক্ষরিত আদেশে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
মাদ্রাসা সূত্রের দাবি, দায়িত্বে অবহেলা, বিভিন্ন অনিয়ম ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাইফুল ইসলাম মাদ্রাসার প্রশাসনিক ও একাডেমিক কোনো কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।
সাইফুল ইসলাম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর থেকে সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরে প্রতিষ্ঠানটিতে আলিম পর্যায়ের পাঠদান চালু হলে তিনি অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পান।
নিয়োগ বৈধকরণ নিয়ে অভিযোগ
অধ্যক্ষের সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি তাঁর নিয়োগ বৈধকরণের প্রক্রিয়া নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে। মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি শেখ নাজিম উদ্দিন এ বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
সর্বশেষ গত ২৭ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক, গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক, মুকসুদপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন তিনি। এর আগে ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছেও একই বিষয়ে অভিযোগ দিয়েছিলেন। পরদিন অভিযোগটি চেয়ারম্যানের দপ্তরে গ্রহণ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০২ সালে সাইফুল ইসলামের নিয়োগ বৈধকরণের আইনগত ভিত্তি কী ছিল, তা যাচাই করা প্রয়োজন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকলে কিংবা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই তা বৈধ করা হয়ে থাকলে সেটি তৎকালীন প্রযোজ্য বিধিবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
এ কারণে মূল নিয়োগপত্র, নিয়োগসংক্রান্ত সভার কার্যবিবরণী, বৈধকরণ আদেশ, অনুমোদনপত্র এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথি সংগ্রহ করে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
১৯৯৫ সালের নীতিমালা ও ২০০১ সালের নির্দেশনা অভিযোগের পক্ষে প্রাসঙ্গিক হিসেবে ২০০১ সালের ২৭ ডিসেম্বর জারি করা একটি নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা’ বইয়ের ৫২০ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালের ২৪ অক্টোবর জারি করা জনবল কাঠামো অনুসরণ করে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
তৎকালীন মহাপরিচালক ড. এ টি এম শরীফ উল্লাহর স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনার ১১ নম্বর ধারায় ১৯৯৫ সালের ২৪ অক্টোবরের পর নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘বৈধকরণ বিধি’ অকার্যকর হিসেবে বিবেচিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
তবে নির্দেশনাটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, শেখ আব্দুর রাজ্জাক আলিম মাদ্রাসার ক্ষেত্রে এর প্রযোজ্যতা এবং ২০০২ সালে সাইফুল ইসলামের নিয়োগ বৈধকরণের সময় কোন বিধি অনুসরণ করা হয়েছিল, তা এখনো মূল নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রযোজ্য আইন ও বিধি, বৈধকরণের আদেশ এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে জমা দেওয়া অভিযোগের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেটিও জানতে চেয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের একটি বিজ্ঞপ্তিতে প্রশাসনিক সেবা, কমিটি-সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং আপিল-সালিশসংক্রান্ত দায়িত্বের সঙ্গে উপ-রেজিস্ট্রার (প্রশাসন) মো. আবদুর রশীদের নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে ওই বিজ্ঞপ্তি থেকে সাইফুল ইসলামের নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন কি না, তা জানা যায়নি।
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি শেখ নাজিম উদ্দিন জানান, উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।