ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে কৃষ্ণ সাগরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কৃষ্ণ সাগরে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন পরিবেশ ও সামুদ্রিক প্রাণী গবেষকেরা। তাঁদের মতে, যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের সামরিক সরঞ্জাম, ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ এবং সোনার প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারে ডলফিনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এতে দিকনির্ণয়, যোগাযোগ ও খাবার খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে অনেক প্রাণী মারা যাচ্ছে।
আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দক্ষিণ ইউক্রেনের তুজলি লেগুনস ন্যাশনাল পার্কের প্রধান গবেষক ইভান রুসেভ জানান, ২০২২ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই কৃষ্ণ সাগরে ডলফিনের ব্যাপক মৃত্যু ঘটছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা, ডলফিনের বেঁচে থাকা ও শিকার ধরার অন্যতম প্রধান উপায় ইকোলোকেশন। শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে আশপাশের পরিবেশ, অবস্থান ও শিকারের অবস্থান নির্ণয় করে তারা। কিন্তু যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের সামরিক প্রযুক্তি থেকে উৎপন্ন তীব্র শব্দ এবং সোনার তরঙ্গ এই প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটায়। ফলে ডলফিন দিক হারায়, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগে সমস্যায় পড়ে এবং খাবার খুঁজে পেতেও ব্যর্থ হয়।
দীর্ঘ সময় খাবার না পেলে ডলফিনের শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। শক্তির জোগান দিতে শরীরে জমা চর্বি ভাঙতে শুরু করে। গবেষকদের মতে, কৃষ্ণ সাগরের দূষিত পরিবেশে প্লাস্টিক, অ্যান্টিবায়োটিক ও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের প্রভাবে ডলফিনের শরীরে বিষাক্ত উপাদান জমা হতে পারে। চর্বি ভাঙার সময় এসব ক্ষতিকর উপাদান শরীরে ছড়িয়ে পড়লে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। এতে শ্বাসতন্ত্রের গুরুতর সংক্রমণসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি বাড়ে।
যুদ্ধের কারণে শুধু শব্দদূষণই নয়, জেলেদের মাছ ধরার জালও ডলফিনের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছে। জালে আটকে শ্বাস নিতে না পেরে অনেক ডলফিন মারা যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে জাল থেকে ছাড়াতে গিয়ে জেলেরা ডলফিনের পাখনা কেটে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে মৃত ডলফিন উপকূলে ভেসে আসছে।
যুদ্ধবিমান ও ড্রোন ধ্বংস, সাবমেরিন ডুবে যাওয়া এবং সামরিক কর্মকাণ্ড থেকে ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিক পদার্থ ও জ্বালানিও কৃষ্ণ সাগরের পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করছে। এর প্রভাবে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা। ডলফিনের পাশাপাশি বিভিন্ন মাছের প্রজাতির সংখ্যাও কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তাঁরা।
সমুদ্রের পানিতে বিস্ফোরণের তীব্র শব্দে মাছের শ্রবণক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক মাছ মারা যাচ্ছে বলেও দাবি গবেষকদের। এতে সামুদ্রিক মাছের ওপর নির্ভরশীল পরিযায়ী পাখিরা খাদ্যসংকটে পড়ছে। উত্তর ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাতায়াতকারী এসব পাখি পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে পথেই মারা যেতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পাখিদের প্রজনন ও বংশবিস্তারের ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কৃষ্ণ সাগরের উপকূলে নিয়মিত মৃত ও আহত ডলফিন ভেসে আসার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। ওডেসা শহরের বাসিন্দা তেতিয়ানা স্মোলচেঙ্কো জানান, সমুদ্রসৈকতে পচে যাওয়া একটি ডলফিনের দেহ দেখে তাঁর আট বছর বয়সী সন্তান কেঁদে ফেলেছিল।
তিনি বলেন, মানুষের মৃত্যুর খবর শুনতে শুনতে তাঁরা অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও যুদ্ধের কারণে নিরীহ প্রাণীগুলোর এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন।