তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন হোক, নিশ্চিত হোক ন্যায়বিচার

একজন সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়, এটি সত্য উদ্ঘাটন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করারও প্রশ্ন। বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরি বন্ধুর ডাকে বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের সন্দেহ, ছেলেকে হত্যা করে নদে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো- ঘটনার নিরপেক্ষ, দ্রুত ও প্রমাণনির্ভর তদন্ত। পরিবারের সন্দেহকে গুরুত্ব দিতে হবে, আবার তদন্তের ফল প্রকাশের আগে কোনো সম্ভাবনাকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। কারণ, ন্যায়বিচারের প্রথম শর্ত হলো অনুমান নয়, তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পর এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরে তার মা একাধিকবার ফোন করেও যোগাযোগ করতে পারেননি। রাত ১টার পর তিনি মাকে বার্তা দিয়ে বাসায় ফেরার কথা জানান। কিন্তু পরদিন তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় তার মরদেহ। এই সময়ের মধ্যে কী ঘটেছিল, তিনি কোথায় গিয়েছিলেন এবং কীভাবে নদ পর্যন্ত পৌঁছালেন- এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাহসিফের বাবা জানিয়েছেন, ছেলের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল বলে তিনি জানতেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাহসিফ ছিলেন সামাজিক ও প্রাণবন্ত। চাকরি হারানোর কারণে কিছুটা মন খারাপ থাকলেও আত্মহত্যা করার মতো পরিস্থিতি ছিল বলে তিনি মনে করেন না। তবে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা সম্পর্কে পরিবারের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে তা একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। একইভাবে, শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান আঘাত না থাকার তথ্যও মৃত্যুর ধরন নিশ্চিত করে না।
তাই তদন্তে প্রতিটি সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। তাহসিফের ফোনের কললিস্ট ও বার্তা, তার শেষ অবস্থান, সম্ভাব্য সিসিটিভি ফুটেজ, যাদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছিলেন তাদের বক্তব্য এবং নদে মরদেহ উদ্ধারের স্থান ও পরিস্থিতি- সবকিছু সমন্বিতভাবে পরীক্ষা করতে হবে। ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষার ফলও যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। কোনো তথ্য উপেক্ষা করা কিংবা আগেভাগে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, দুটিই সত্য উদ্ঘাটনের পথে বাধা হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে কথা বলা হবে। তদন্তের ফলের অপেক্ষা করা যুক্তিসংগত। তবে সেই অপেক্ষা যেন দীর্ঘসূত্রতায় পরিণত না হয়। পরিবারকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে যথাসম্ভব অবহিত রাখা এবং অভিযোগের ভিত্তিতে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। যাচাইহীন তথ্য, অনুমানভিত্তিক অভিযোগ কিংবা কাউকে প্রমাণ ছাড়াই দায়ী করার প্রবণতা এড়িয়ে চলতে হবে। এতে একদিকে তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে নিরপরাধ কারও সম্মানহানিও হবে না। সত্য প্রকাশের দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে সংযম বজায় রাখাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ।
তাহসিফের মৃত্যু দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি অপরাধমূলক কোনো ঘটনার ফল—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তাই কোনো একটি ব্যাখ্যাকে আগেভাগে গ্রহণ না করে সব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে হবে। তদন্তে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। আর অন্য কোনো কারণ প্রতিষ্ঠিত হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
একটি পরিবারের শোকের অবসান ঘটানো সম্ভব নয়; তবে সত্য জানা ও ন্যায়বিচার পাওয়া তাদের অধিকার। তাহসিফের মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোর গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে হলে তদন্ত হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সময়োপযোগী। অনুমান নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদ্ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগই পারে এই ঘটনার রহস্য দূর করতে ও জনমনে আস্থা বজায় রাখতে।