সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • অপরাধ দমনে ক্রসফায়ারের হুঁশিয়ারি নয়, আইনের শাসনই হোক পুলিশের শক্তি জাইকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক, জ্বালানি খাতে সহায়তা চাইল বাংলাদেশ দুবাইয়ে সিআইপি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত ট্রাকচালক হোসেন হত্যা মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিচার শুরু সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি ডেঙ্গুতে ৫ ও হামের উপসর্গে ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ৩ হাজার ৬৮৪ প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও দলগত কাজই ফ্লাইট সেফটির মূল ভিত্তি: বিমানবাহিনী প্রধান ডিগ্রি নয়, মানুষের জীবন বদলাতে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ‘তোমরাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে’, শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রপতি বাস, ট্রেন বা বিমানে জানালার পাশে বসতে ভালোবাসেন যারা, তাদের বৈশিষ্ট্য কী?
  • অপরাধ দমনে ক্রসফায়ারের হুঁশিয়ারি নয়, আইনের শাসনই হোক পুলিশের শক্তি

    অপরাধ দমনে ক্রসফায়ারের হুঁশিয়ারি নয়, আইনের শাসনই হোক পুলিশের শক্তি
    ছবি: এআই
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না—পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের এমন বক্তব্য জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অপরাধ দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা জরুরি হলেও রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রধানের কাছ থেকে এমন বক্তব্যের ক্ষেত্রে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং বিচারবহির্ভূত বলপ্রয়োগের ঝুঁকির বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

    পুলিশের দায়িত্ব অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা এবং নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় আইনগত ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ হতে হবে সংবিধান, প্রচলিত আইন ও মানবাধিকারের নীতিমালা অনুসারে। অপরাধ দমনের নামে কাউকে বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের শিকার করার ধারণা আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

    ক্রসফায়ার শব্দটি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত। অতীতে এ ধরনের ঘটনা নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন, জবাবদিহির অভাব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ফলে অপরাধ দমনে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা তুলে ধরা কোনো সাধারণ বক্তব্য নয়। বরং এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের পদ্ধতি এবং নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। অপরাধ যত গুরুতরই হোক, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার পাওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।

    আইজিপি তাঁর বক্তব্যে পুলিশের বিরুদ্ধে ‘ফ্যাসিস্ট’ কিংবা ‘দুর্বল’—এমন দুই ধরনের সমালোচনার কথা তুলে ধরেছেন। পুলিশের ওপর চাপ, সদস্যদের নিরাপত্তা, মাদক বিস্তার এবং বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে তাঁর উদ্বেগের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা বা বাধা সৃষ্টি হলে তারও আইনানুগ প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। তবে পুলিশের সমালোচনা এবং পুলিশকে অকার্যকর করার চেষ্টা এক বিষয় নয়। পুলিশের জবাবদিহি দাবি করা নাগরিকের অধিকার, আর দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া আইনগতভাবে ভিন্ন বিষয়। এ দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।

    আইজিপি আরও বলেছেন, গত দুই মাসে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁর এ বক্তব্য সঠিক হলে তা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে। তবে শুধু কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়; অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ বিচার এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত অবস্থান কিংবা প্রভাবের কারণে কেউ যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ না পান, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

    মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার তরুণ প্রজন্ম, পরিবার ও সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। কিন্তু মাদকবিরোধী অভিযান কেবল গ্রেপ্তার বা বলপ্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, চোরাচালান ও অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধান, প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে-ই থাকুক, তার বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

    একই অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন আইজিপি। তিনি বলেছেন, সুদ ও ঘুষের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান এবং ব্যাংকিং খাতে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। তাঁর এই বক্তব্যের মূল বার্তা—প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর রাখতে নিয়ম, নৈতিকতা ও জবাবদিহি অপরিহার্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান যত শক্তিশালী হবে, তার জবাবদিহির ব্যবস্থাও তত কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।

    পুলিশের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের সমালোচনা এবং সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়েও আইজিপি প্রশ্ন তুলেছেন। কোনো সাংবাদিক বা নাগরিক অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো পেশাজীবী গোষ্ঠী সম্পর্কে সামগ্রিক অভিযোগ তোলা সমীচীন নয়। সাংবাদিকদের কাজ অপরাধ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার তুলে ধরা; একই সঙ্গে সংবাদ প্রকাশে তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত সততা বজায় রাখাও তাঁদের দায়িত্ব। পুলিশেরও উচিত সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে জবাব দেওয়া।

    জুলাই অভ্যুত্থানের পর পুলিশের দায়িত্ব পালনে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে একটি কার্যকর ও জনবান্ধব বাহিনী গড়ে তোলা জরুরি। এ জন্য পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, পেশাগত দক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগ তদন্তের স্বাধীনতা, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।

    রাষ্ট্রের শক্তি শুধু কঠোর অভিযানে নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে। পুলিশকে কার্যকর করতে হলে তাকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দিতে হবে, তবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা ও জবাবদিহিও স্পষ্ট রাখতে হবে। অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত বলপ্রয়োগের ইঙ্গিত নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকারই জনআস্থা বাড়াতে পারে। অপরাধীর বিচার হবে আদালতে, প্রমাণের ভিত্তিতে; আর পুলিশের প্রতিটি পদক্ষেপ হবে আইন ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে। এ পথেই নিরাপদ সমাজ, কার্যকর পুলিশ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ