পুলিশের ওপর হামলা কোনো আন্দোলন নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্রকে হতে হবে কঠোর

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুরে সংঘর্ষের মধ্যে এক পুলিশ সদস্যকে মাটিতে ফেলে মারধরের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে কালশী সড়কে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, দাবি আদায়ের আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হলে তার মাশুল দিতে হয় পুরো সমাজকে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের ইটপাটকেল নিক্ষেপের মুখে পুলিশ সদস্যরা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিলেন। এ সময় সাইমন নামের এক পুলিশ সদস্য অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে কয়েকজন তাঁকে ঘিরে ধরে মাটিতে ফেলে মারধর করেন। আহত অবস্থায় তাঁকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
কোনো সভ্য সমাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর এ ধরনের হামলা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালনকালে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন কিংবা প্রতিরোধের সুযোগ পাননি- এমন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তাঁকে দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করা নিছক সহিংসতা নয়, এটি আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত। ইউনিফর্ম পরা একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির ওপর হামলা মানে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা।
পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য দাবি, বেতন-ভাতা, কর্মপরিবেশ কিংবা চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে অসন্তোষ থাকলে তা প্রকাশের অধিকার অবশ্যই রয়েছে। শ্রমিকদের বক্তব্য শোনা এবং তাঁদের যৌক্তিক দাবির সমাধান করা সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব। কিন্তু সেই দাবিকে সামনে রেখে সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার কোনো নৈতিক বা আইনগত বৈধতা নেই।
একটি আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহিংসতার দায়ে অভিযুক্ত করাও ঠিক হবে না। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডকে আলাদা করে দেখতে হবে। যারা শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানাচ্ছেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। অন্যদিকে, যারা পরিকল্পিতভাবে হামলা, ভাঙচুর বা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করছেন, তাঁদের পরিচয় ও ভূমিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহিংস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে পেশাদারত্ব, সংযম ও আইনানুগ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে, তবে তা যেন কোনোভাবেই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা নিরপরাধ মানুষের হয়রানির কারণ না হয়। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহকর্মীদের সহায়তা নিশ্চিত করাও বাহিনীর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
মিরপুরে পুলিশ সদস্য সাইমনের ওপর হামলার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা জরুরি। তবে কাউকে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আহত পুলিশ সদস্যের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁর নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের জানমাল ও জননিরাপত্তা রক্ষা করা। শ্রমিকের অধিকার যেমন রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের নিরাপত্তাও অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। এক পক্ষের অধিকার রক্ষার নামে অন্য পক্ষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।
মিরপুরের ঘটনা থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে শিক্ষা নিতে হবে। শ্রমিকদের দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে, আর সহিংসতা ও হামলার ঘটনায় কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। আন্দোলনের নামে যারা দুষ্কৃতিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ায়, তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশকে দায়িত্ব পালনে আরও সতর্ক, দক্ষ ও পেশাদার করে তুলতে হবে। আইন সবার জন্য সমান- এই নীতির বাস্তব প্রয়োগই পারে জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রাখতে।