রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • হৃদয়ের রেকর্ডের পর হতাশ বাংলাদেশ, ৩১৫ রানে এগিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ চোখের রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন সমন্বিত চিকিৎসা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে সরকার মাদক ও বাল্যবিবাহমুক্ত লালমনিরহাট গড়তে প্রধানমন্ত্রীর সফর ১৯ নভেম্বর স্মিথ-ওয়ার্নারের বিদায়ের পর অধিনায়কত্ব না পাওয়ার কারণ জানালেন খাজা বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার মিশনের প্রধান হলেন সাবিন লাউবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের এনআইডি নিবন্ধনের পরিকল্পনা ইসির এসআরবির নতুন ডিজি হলেন অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহমেদ আমন সংগ্রহে সিদ্ধ চাল ৪৯, আতপ ৪৮ ও ধানের দাম ৩৫ টাকা নির্ধারণ পরীমনিকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে ৭ দিনের লিগ্যাল নোটিশ
  • তরুণদের মন জয় করতে হলে বাস্তবতা বুঝতে হবে

    তরুণদের মন জয় করতে হলে বাস্তবতা বুঝতে হবে
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনদের একটি সাধারণ প্রবণতা হলো, নিজেদের জনপ্রিয়তা নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা। রাষ্ট্রক্ষমতা, প্রচারযন্ত্র, রাজনৈতিক সংগঠন ও অর্থনৈতিক শক্তির ওপর ভর করে অনেকেই মনে করেন, জনমত নিজেদের পক্ষে ধরে রাখা সম্ভব। কিন্তু নির্বাচনের ফল যখন মানুষের প্রকৃত মনোভাব প্রকাশ করে, তখন সেই আত্মবিশ্বাসের ভিত নড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচন তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের অবস্থান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হয়ে এসেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তরুণদের ভোটই ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি হতাশা তরুণদের ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে দুই দলের ভোটের ব্যবধান প্রায় ৪০ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে গেছে। তরুণ পুরুষদের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ছিল ৩৯ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৭ শতাংশ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তরুণ পুরুষদের একটি বড় অংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করলেও এবার তাঁদের অনেকেই অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।

    তবে এই পরিবর্তন একেবারে আকস্মিক ছিল না। এর আভাস পাওয়া যাচ্ছিল আগেই। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘Young Voters Are Turning Away From Trump. Here's Why অর্থাৎ, তরুণ ভোটাররা ট্রাম্পের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপের তথ্য তুলে ধরে ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়, তরুণদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা দ্রুত কমছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে তাঁর সমর্থন ছিল ৩৯ শতাংশ। অথচ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইকোনমিস্টের এক জরিপে এই বয়সীদের মধ্যে তাঁর প্রতি সমর্থন নেমে আসে ২৫ শতাংশে। বিপরীতে, ৬৭ শতাংশ তাঁর কর্মকাণ্ডের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

    প্রশ্ন হলো, এত অল্প সময়ের মধ্যে তরুণদের মনোভাবের এমন পরিবর্তন কেন ঘটল? টাইমের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি, অভিবাসননীতি ও পররাষ্ট্রনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি তরুণদের অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে। অন্যদিকে, নিউইয়র্ক টাইমসের নির্বাচনি বিশ্লেষণে বাড়িভাড়া, চিকিৎসার ব্যয়, চাকরির অনিশ্চয়তা, ইরান যুদ্ধ এবং ইসরায়েলনীতি নিয়ে অসন্তোষকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, তরুণেরা রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা প্রচারণার চেয়ে নিজেদের জীবনের বাস্তব পরিস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের কাছে রাজনীতির সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠি হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা।

    এখানেই রাজনীতিকদের জন্য বড় শিক্ষা রয়েছে। তরুণেরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি চিরস্থায়ীভাবে অনুগত থাকেন না। ২০২৪ সালে যাঁরা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের একাংশই ২০২৬ সালে তাঁর বিরোধিতা করেছেন। আবার ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করলেই যে তাঁদের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য তৈরি হয়েছে, এমনটিও নয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁদের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করছেন, জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখছেন—এসব বিষয় তরুণেরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। ফলে শুধু নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়িয়ে তাঁদের আস্থা অর্জন করা কঠিন।

    এই প্রবণতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেই দেখা যাচ্ছে না। নিউইয়র্ক টাইমস বাংলাদেশ, ভারত, সার্বিয়া ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের তরুণদের অসন্তোষ ও আন্দোলনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছে। কর্মসংস্থানের সংকট, বাড়িভাড়ার বাড়তি চাপ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে তরুণদের উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে আগের প্রজন্মের তুলনায় নিজেদের জন্য সুযোগ-সুবিধা কমে যাওয়ার অনুভূতিও তাঁদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করছে।

    তরুণদের এই অসন্তোষকে কেবল বয়সের আবেগ কিংবা সাময়িক উত্তেজনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁদের প্রত্যাশা, চিন্তাভাবনা ও প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। অবশ্য তরুণেরা সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেন, এমন নয়। আবেগ, অপরিপক্বতা কিংবা সাময়িক জনপ্রিয়তার মোহ তাঁদেরও প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু তাঁদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁরা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন এবং বর্তমানের বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের প্রত্যাশার মিল খুঁজতে চান। প্রয়োজন হলে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানও পরিবর্তন করেন। কোনো দল বা নেতার প্রতি অন্ধ আনুগত্যের বদলে কাজের মূল্যায়ন করেই সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হন।

    রাজনীতিকদের মনে রাখা প্রয়োজন, তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হলে শুধু বক্তব্যে পরিবর্তনের কথা বললে চলবে না; বাস্তব জীবনেও তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, সাশ্রয়ী আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তরুণদের প্রশ্নকে বিরোধিতা হিসেবে না দেখে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অংশ হিসেবে গ্রহণ করাই হবে বিচক্ষণতা।

    প্রকৃতপক্ষে, তরুণেরা শুধু বর্তমানের ভোটার নন, তাঁরা আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি। তাঁদের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখা সম্ভব নয়। প্রচার, ক্ষমতা কিংবা অর্থের প্রভাব দিয়ে সাময়িকভাবে জনমতকে প্রভাবিত করা গেলেও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা আড়াল করা যায় না। বিশেষ করে তরুণদের সচেতন দৃষ্টিকে ফাঁকি দেওয়া কঠিন। তাই তাঁদের মন জয় করতে হলে প্রতিশ্রুতির চেয়ে কাজের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন