বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj

মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি: সুফল নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি: সুফল নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
ছবি: এআই
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

ঢাকার যানজট কমানো, গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক করা এবং নগরবাসীর যাতায়াত সহজ করতে মেট্রোরেলকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেই মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে একসঙ্গে তিনটি প্রকল্প অনুমোদন নিঃসন্দেহে রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থার জন্য বড় উদ্যোগ। তবে একই সঙ্গে চলমান দুটি প্রকল্পের ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।

বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মেট্রোরেল-সংক্রান্ত তিনটি প্রকল্পসহ মোট ১২টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় অনুমোদন করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত হয়েছে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্প।

মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে সময়ের সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য, জমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত চাহিদা ও অর্থায়ন ব্যয় বাড়তে পারে। কিন্তু কোনো প্রকল্পের মূল ব্যয়ের তুলনায় সংশোধিত ব্যয় যখন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তখন এর কারণ, যৌক্তিকতা এবং ভবিষ্যৎ ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতিটি টাকা শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ। বড় প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি যদি প্রকৃত প্রয়োজন, উন্নত প্রযুক্তি বা পরিধি সম্প্রসারণের কারণে হয়, তার ব্যাখ্যা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে প্রাথমিক পরিকল্পনা ও ব্যয় নির্ধারণে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা দরকার।

এমআরটি লাইন-১ ঢাকার প্রথম পাতাল মেট্রোরেল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিমানবন্দর, উত্তরা, রামপুরা, কমলাপুরসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকার যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ হওয়ার কথা। অন্যদিকে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন চালু হলে উত্তর ও পূর্ব ঢাকার একটি বড় অংশ আধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে।

আর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর উল্লেখযোগ্য অংশ ভূগর্ভস্থ হওয়ার পরিকল্পনা। গাবতলী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার ও তেজগাঁও হয়ে হাতিরঝিল-আফতাবনগর পর্যন্ত এই করিডোর রাজধানীর ব্যস্ত এলাকার পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে শুধু মেট্রোরেল নির্মাণ করলেই যানজটের স্থায়ী সমাধান হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। মেট্রোরেলের সঙ্গে বাস রুট, রেল, নৌপথ, ফুটপাত, সাইকেলপথ এবং পার্কিং ব্যবস্থার কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। মেট্রো স্টেশনে যাত্রী পৌঁছানো ও সেখান থেকে গন্তব্যে যাওয়ার শেষ ধাপের পরিবহনব্যবস্থা দুর্বল থাকলে বিপুল বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল কমে যেতে পারে।

এ কারণে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো প্রকল্পগুলোর সময়মতো এবং নির্ধারিত মান বজায় রেখে বাস্তবায়ন। ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি যেন বারবার সময় বাড়াতে না হয়, সেদিকে কঠোর নজর দিতে হবে। নির্মাণকাজে স্বচ্ছতা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ নিশ্চিত করা দরকার।

মেট্রোরেল শুধু একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি ঢাকার ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার অংশ। তাই প্রতিটি লাইনের সঙ্গে আবাসন, কর্মসংস্থান, বাণিজ্যিক এলাকা, পথচারী চলাচল এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

বিশাল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো যেন কয়েক দশক কার্যকর থাকে, সে বিষয়টিও শুরু থেকেই নিশ্চিত করতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, দক্ষ জনবল এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবস্থাপনা না থাকলে নির্মাণের পরও প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল ধরে রাখা কঠিন হবে।

ঢাকার যানজট ও গণপরিবহনের সংকট দীর্ঘদিনের। তাই মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সময়ানুবর্তিতা, স্বচ্ছতা ও সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিপুল বিনিয়োগের এই প্রকল্পগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা জনবান্ধব ও কার্যকর হলো, তার মূল্যায়ন হবে নির্মাণ ব্যয়ের আকারে নয়—নগরবাসীর সময়, অর্থ ও দুর্ভোগ কতটা কমল, সেটির ওপর।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন