নাম বদল নয়, নতুন সংস্কৃতির এসআরবি চাই

র্যাব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) গঠনের আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও নানা বিতর্কে থাকা একটি বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবসান ঘটিয়ে নতুন কাঠামোর বাহিনী গঠনের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসআরবির সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নাম পরিবর্তন বা নতুন ইউনিফর্মের ওপর নয়; বরং এটি কতটা আইনের শাসন, মানবাধিকার, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, তার ওপর।
র্যাব গঠনের পর সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে বাহিনীটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। ফলে র্যাবের বিলুপ্তি ও নতুন বাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে সরকারের সামনে একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে—অতীতের বিতর্ক থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও আধুনিক, দক্ষ ও মানবিক একটি বিশেষায়িত বাহিনী গড়ে তোলার।
এই জায়গাতেই এসআরবিকে আলাদা হতে হবে।
নতুন বাহিনী যদি কেবল র্যাবের জনবল, সম্পদ, কাঠামো ও পুরোনো কার্যপদ্ধতি নিয়ে নতুন নামে কাজ শুরু করে, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। এতে বাহিনীর নাম বদলালেও মানুষের অভিজ্ঞতা বদলাবে না। বরং এসআরবির শুরু থেকেই এমন একটি সাংগঠনিক সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো সদস্য আইনবহির্ভূত নির্দেশ পালন করার অজুহাত দেখাতে পারবেন না এবং কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করেও পার পেয়ে যাবেন না।
নতুন আইনে গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও আলামত জব্দের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণের পাশাপাশি গ্রেপ্তার ব্যক্তি ও জব্দ করা আলামত দ্রুত থানায় হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। এসব বিধান যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে তদন্ত ও অপারেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা, লিখিত আদেশ এবং যথাযথ নথিপত্র নিশ্চিত করা জরুরি।
এসআরবির সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত জবাবদিহি। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে নির্যাতন, বেআইনি আটক, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অন্য কোনো গুরুতর অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। অভিযোগ প্রতিকার কমিটি যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগকারী ব্যক্তি ও ভুক্তভোগী পরিবার যাতে ভয় বা চাপ ছাড়াই অভিযোগ জানাতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে র্যাবের পুরোনো নথি, অভিযানসংক্রান্ত তথ্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা দরকার। অতীতের কোনো ঘটনা নিয়ে ভবিষ্যতে তদন্ত বা বিচার প্রয়োজন হলে যেন তথ্য-প্রমাণের ঘাটতি তৈরি না হয়, সে জন্য নথিগুলো স্বচ্ছ ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতায় রাখতে হবে। কোনো তথ্য গোপন, পরিবর্তন বা নষ্ট করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
এসআরবির সদস্যদের প্রশিক্ষণেও বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। আধুনিক অপরাধ দমনের কৌশলের পাশাপাশি মানবাধিকার, আইন, গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের নিয়ম, ডিজিটাল ফরেনসিক, সাইবার অপরাধ এবং বেসামরিক নাগরিকের সঙ্গে আচরণ বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। একজন দক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যের কাছে অপরাধী দমন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিরপরাধ মানুষের অধিকার রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এসআরবিকে এমন একটি বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যার কাছে সাধারণ মানুষ ভয় নয়, নিরাপত্তার প্রত্যাশা নিয়ে যাবে। অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোরতা থাকবে, কিন্তু সেই কঠোরতা অবশ্যই আইনের সীমার মধ্যে থাকবে। কোনো রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর স্বার্থে বাহিনীকে ব্যবহার করা যাবে না। সরকারের প্রতি আনুগত্যের চেয়ে সংবিধান ও আইনের প্রতি আনুগত্যই হবে সদস্যদের প্রধান দায়িত্ব।
একই সঙ্গে এসআরবির কর্মকাণ্ডে প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সব অপারেশন প্রকাশ্যে জানানো সম্ভব নয়—রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গোপনীয়তার প্রয়োজন থাকতেই পারে। কিন্তু সেই গোপনীয়তা যেন জবাবদিহি এড়ানোর হাতিয়ার না হয়। সংসদীয় নজরদারি, অভ্যন্তরীণ তদারকি এবং আইনসম্মত স্বাধীন তদন্তের সুযোগ থাকতে হবে।
নতুন বাহিনীর সামনে তাই শুধু অপরাধ দমনের চ্যালেঞ্জ নয়, নিজেদের একটি নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এসআরবি যদি র্যাবের বিতর্কিত অধ্যায়গুলো থেকে শিক্ষা নেয় এবং পেশাদারিত্ব, মানবিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে এটি দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
র্যাবের জায়গায় এসআরবি—এটি যেন শুধু একটি নামের পরিবর্তন না হয়। এটি হোক আইনবহির্ভূত সংস্কৃতি থেকে আইনের শাসনে, ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে জবাবদিহিতে এবং ভয়ভিত্তিক ভাবমূর্তি থেকে জনআস্থার পথে যাত্রা।
দেশের মানুষ এমন একটি বিশেষায়িত বাহিনীই দেখতে চায়, যারা অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর, কিন্তু আইনের প্রতি আরও কঠোর; যারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা করবে, একই সঙ্গে নাগরিকের অধিকারও সমান গুরুত্বে রক্ষা করবে। সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারলেই এসআরবি সত্যিকার অর্থে র্যাবের বিকল্প নয়, বরং একটি উন্নত ও আধুনিক নতুন অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে উঠবে।