ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন বেড়েছে ১৩ শতাংশ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে আশ্রয়ের আবেদন সামগ্রিকভাবে কমলেও বাংলাদেশি নাগরিকদের আবেদন বেড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইইউভুক্ত দেশসহ সুইজারল্যান্ড ও নরওয়েতে বাংলাদেশিদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলাম (ইইউএএ) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ইইউ+ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য মোট ৩ লাখ ৩২ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ১৭ শতাংশ কম। ২০২১ সালের পর বছরের প্রথমার্ধে এটিই সর্বনিম্ন আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা।
তবে সামগ্রিকভাবে আবেদন কমলেও বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপের দেশগুলোতে ১৭ হাজার ৩২৭ জন বাংলাদেশি আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৫২১ জনে। অর্থাৎ এক বছরে বাংলাদেশিদের আবেদন বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ।
ইইউএএ বলছে, সিরিয়ায় রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে দেশটির নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে মূল উৎপত্তিস্থল ও ট্রানজিট দেশগুলোর সঙ্গে ইইউর কূটনৈতিক উদ্যোগও আবেদন কমার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গেও সম্প্রতি চুক্তি করেছে ইইউ। তিউনিসিয়া ও মৌরিতানিয়াসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে এসব চুক্তির আওতায় অর্থনৈতিক সহায়তা ও বিনিয়োগের বিনিময়ে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ব্রাসেলস। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে আশ্রয় আবেদনে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে ইইউএএ।
আশ্রয় আবেদনে তৃতীয় বাংলাদেশ
ইইউ+ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি আশ্রয় আবেদন করেছেন আফগানিস্তানের নাগরিকরা। প্রথম ছয় মাসে প্রায় ৩৯ হাজার আফগান নাগরিক আবেদন করেছেন। এরপর রয়েছে ভেনেজুয়েলা ও বাংলাদেশ। প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক এ সময়ে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।
বাংলাদেশিদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে নতুন অভিবাসন নীতির কারণে। গত জুনে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যেসব দেশের নাগরিকদের আবেদন মঞ্জুরের হার ২০ শতাংশের কম অথবা যেসব দেশকে ইইউ ‘নিরাপদ দেশ’ হিসেবে বিবেচনা করে, তাদের আবেদন দ্রুত যাচাই করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও নেওয়া হচ্ছে।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে জমা পড়া আবেদনের প্রায় ৫৬ শতাংশ এই দ্রুত প্রক্রিয়ার আওতায় পড়েছে। এ তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি মিসর, ভেনেজুয়েলা ও তুরস্কের নাগরিকরাও রয়েছেন। তুরস্ক ছাড়া এসব দেশের আবেদন মঞ্জুরের হার প্রথম ধাপে ৫ শতাংশের নিচে ছিল।
ইইউএএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে নিষ্পত্তি হওয়া আবেদনগুলোর এক-তৃতীয়াংশেরও কম অনুমোদন পেয়েছে।
কোন দেশে বেশি আবেদন
ইইউ সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আশ্রয় আবেদন পেয়েছে ফ্রান্স। দেশটিতে ৬৯ হাজার আবেদন জমা পড়েছে, যা মোট আবেদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এরপর রয়েছে ইতালি ৬৬ হাজার, স্পেন ৫৫ হাজার এবং জার্মানি ৫৫ হাজার। এই চার দেশেই মোট আবেদনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জমা পড়েছে।
তবে জনসংখ্যার অনুপাতে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে গ্রিসে। দেশটিতে এ সময়ে প্রায় ২৩ হাজার আশ্রয় আবেদন জমা হয়েছে।
১১ লাখের বেশি মামলা অপেক্ষমাণ
ইইউএএর প্রতিবেদনে আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রিতার চিত্রও উঠে এসেছে। জুনের শেষে ইইউ+ অঞ্চলে প্রথম ধাপে প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার আবেদন প্রক্রিয়াধীন ছিল, যা এক বছর আগের তুলনায় ৮ শতাংশ কম।
তবে প্রশাসনিক ও বিচারিক সব ধাপ মিলিয়ে মোট অপেক্ষমাণ মামলার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার।
প্রথম ধাপে সবচেয়ে বেশি মামলা অপেক্ষমাণ রয়েছে ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের—প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার। এরপর সিরিয়ার ৭৬ হাজার, কলম্বিয়ার ৬৪ হাজার, পেরুর ৩৮ হাজার এবং বাংলাদেশের প্রায় ৩৬ হাজার মামলা রয়েছে।
নতুন আবেদন নিষ্পত্তির গতি বাড়লেও ছয় মাসের বেশি পুরোনো মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ফলে প্রক্রিয়াধীন মামলাগুলোর মধ্যে পুরোনো মামলার হার গত বছরের ৬৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইউরোপে আশ্রয় আবেদনের সামগ্রিক প্রবণতা নিম্নমুখী হলেও বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে তা উল্টো। আবেদন বাড়ার পাশাপাশি অপেক্ষমাণ মামলার সংখ্যাতেও বাংলাদেশি নাগরিকদের অবস্থান শীর্ষ সারিতে রয়েছে।
সূত্র: ইইউএএ, এএফপি