সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • হামের উপসর্গে একদিনে আরও ৭ মৃত্যু, শনাক্ত ১ হাজারের বেশি স্টাম্প মাইকে ধরা পড়ল লিটন-স্মিথের তপ্ত বাক্যযুদ্ধ সরকারের ১৮০ দিন: স্বাস্থ্য খাতে উদ্যোগের ছড়াছড়ি, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ আল কায়েদা নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন আমলে নিচ্ছে না সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ-কানাডার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে গুরুত্ব পাচ্ছে সামরিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ উপসচিবের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া নিয়োগপত্র, সতর্ক করল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১৮০ দিনে সরকারের অর্জন-উদ্যোগ, সামনে বাস্তবায়নের কঠিন পরীক্ষা ঢাকায় লিথুয়ানিয়ার ভিসা সেন্টার চাইল বাংলাদেশ আবারও পানির নিচে চট্টগ্রাম, চরম দুর্ভোগে নগরবাসী ১৭ আগস্টের সেই ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলার ২১ বছর
  • বিএনপি কি সরকারে মিশে যাচ্ছে?

    বিএনপি কি সরকারে মিশে যাচ্ছে?
    ছবি: সংগৃহীত
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    ক্ষমতার বাইরে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা শুরু হয় তখনই—দল ও সরকারের মধ্যে প্রয়োজনীয় দূরত্ব, ভারসাম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্র্য কতটা বজায় রাখা যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস পেরিয়ে সেই প্রশ্নটিই এখন ক্রমেই সামনে আসছে—বিএনপি কি সরকার পরিচালনা করছে, নাকি ধীরে ধীরে সরকারই বিএনপির সাংগঠনিক পরিসরকে গ্রাস করে ফেলছে?

    প্রশ্নটির পেছনে যথেষ্ট বাস্তবতা রয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বহু নেতা এখন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক কিংবা সরকারি বিভিন্ন দায়িত্বে যুক্ত। অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতাও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে দলের মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে।

    এর স্বাভাবিক ফল হিসেবে দলীয় রাজনীতির গতি কিছুটা কমে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এখানেই রাজনৈতিক দলের জন্য সতর্ক হওয়ার জায়গা। সরকারের দায়িত্ব পালন করা এবং দলকে সক্রিয় রাখা—দুটি ভিন্ন কাজ। একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনা করে, অন্যটি জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি ও বজায় রাখে।

    বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, মাঠের অনেক নেতার রাজনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এমপি-মন্ত্রীদের বাসা, সরকারি দপ্তর এবং ক্ষমতার কেন্দ্র। স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় সমর্থন পাওয়ার প্রতিযোগিতা, সরকারি সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশা কিংবা বিভিন্ন পদে নিয়োগের আকাঙ্ক্ষা যদি দলীয় রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে গড়ে ওঠা সাংগঠনিক চরিত্র দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

    এটি বিএনপির জন্য শুধু সাংগঠনিক সমস্যা নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

    দল ও সরকারের সীমারেখা জরুরি

    একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল সরকারকে রাজনৈতিক সমর্থন দেবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দল এবং রাষ্ট্র একাকার হয়ে গেলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

    বিএনপি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দলীয়করণ, প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ করে এসেছে। সেই দলের কাছ থেকে তাই মানুষের প্রত্যাশাও বেশি। বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে, ক্ষমতায় এসে তারা পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করবে না।

    সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের নিয়োগ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটিও এ কারণেই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। যোগ্যতা থাকলে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত কোনো ব্যক্তি সরকারি দায়িত্ব পেতেই পারেন। কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি মেধা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার বদলে রাজনৈতিক পরিচয় প্রধান বিবেচনায় পরিণত হয়, তাহলে বিএনপির দীর্ঘদিনের দলীয়করণবিরোধী অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়বে।

    রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক সরকারের আস্থাভাজন মানুষের প্রয়োজন আছে—কিন্তু আস্থাভাজন হওয়া আর দলীয় পরিচয়ের কারণে যোগ্যতা অর্জন করা এক বিষয় নয়। এই সীমারেখাটি সরকারকে স্পষ্ট রাখতে হবে।

    সংগঠন দুর্বল হলে সরকারও দুর্বল হয়

    বিএনপির জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো সাংগঠনিক স্থবিরতা। সরকার গঠনের ছয় মাস পরও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির আনুষ্ঠানিক বৈঠক না হওয়া, অঙ্গসংগঠনগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনে দীর্ঘসূত্রতা এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়।

    সরকারের ব্যস্ততার কারণে দলীয় কর্মকাণ্ড সীমিত হতে পারে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের প্রাণ হলো তার তৃণমূল সংগঠন। কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, জনগণের সমস্যা নিয়ে মাঠে থাকা, সরকারের ভুল-ত্রুটি চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন হলে সরকারের কাছেই জনগণের দাবি তুলে ধরা—এসব দায়িত্বও ক্ষমতাসীন দলের।

    বরং সরকারে থাকার সময় দলের একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন রাজনৈতিক কাঠামো আরও বেশি প্রয়োজন। কারণ সরকার যেখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেবে, দল সেখানে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বুঝবে। সরকার কোথায় সফল হচ্ছে, কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে—দলের মাঠপর্যায়ের কর্মী ও নেতাদের কাছ থেকেই সেই বাস্তব চিত্র সবচেয়ে ভালোভাবে পাওয়া সম্ভব।

    জনগণের প্রত্যাশাই মূল পরীক্ষা

    বিএনপি দীর্ঘ আন্দোলনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। মানুষের প্রত্যাশাও তাই অনেক বেশি। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার মতো সমস্যাগুলোর সমাধান দ্রুত চায় মানুষ।

    সরকার ইতোমধ্যে সামাজিক সুরক্ষা, কৃষক ও পরিবার কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। রাজনৈতিক পরিসর ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও তুলনামূলক স্বস্তি তৈরি হয়েছে—এটি অবশ্যই ইতিবাচক।

    কিন্তু উদ্যোগ আর ফলাফল এক নয়। নীতিগত সিদ্ধান্তের সুফল যখন সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে, তখনই তার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে। একইভাবে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সরকারি নিয়োগ কতটা স্বচ্ছ থাকছে এবং প্রশাসন কতটা জবাবদিহির মধ্যে থাকছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও সরকারকে দিতে হবে।

    বিএনপির সামনে বড় রাজনৈতিক সুযোগ

    বর্তমান বিএনপি সরকারের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। তারা চাইলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত ও দলীয়করণের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

    এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন দল ও সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা।

    এমপি-মন্ত্রীদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কেন্দ্র বানানোর পরিবর্তে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের জনগণের সঙ্গে কাজ করতে উৎসাহিত করতে হবে। সরকারি পদ বা সুবিধা পাওয়ার প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সংগঠনকে জনসম্পৃক্ত রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

    সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, সরকার টিকে থাকে প্রশাসনিক ক্ষমতায়, কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল টিকে থাকে জনগণের আস্থায়।

    শেষ কথা

    বিএনপির সামনে এখন মূল প্রশ্ন ক্ষমতা কতটা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, তা নয়; বরং ক্ষমতার সঙ্গে দলীয় রাজনীতির সম্পর্ক কতটা সুস্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক থাকবে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

    সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার দায় বিএনপিকে নিতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপির সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের দায়ও সরকারের ওপর এসে পড়বে। এই পারস্পরিক নির্ভরতা যদি দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা মুছে দেয়, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি—উভয়ের জন্য ক্ষতিকর হবে।

    তাই ছয় মাসের অভিজ্ঞতা বিএনপির জন্য সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। সরকারকে শক্তিশালী করতে হলে দলকে সরকারের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া নয়, বরং দল ও সরকারের নিজ নিজ ভূমিকা স্পষ্ট করতে হবে।

    বিএনপি যদি ক্ষমতাকে সংগঠনের একমাত্র কেন্দ্র না বানিয়ে জনগণকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে পারে, তাহলেই তারা প্রমাণ করতে পারবে—ক্ষমতায় আসা তাদের লক্ষ্য ছিল না; বরং রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে একটি নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই ছিল তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন