১৮০ দিনে সরকারের অর্জন-উদ্যোগ, সামনে বাস্তবায়নের কঠিন পরীক্ষা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, গ্যাসের ঘাটতি, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক ধীরগতির মতো সমস্যার মধ্যেই সরকার দায়িত্ব নেয়। তবে এই সময়ে সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও কূটনীতিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করে সরকার। এর মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো, প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
তবে সরকারের নেওয়া অনেক উদ্যোগের সুফল এখনও সাধারণ মানুষের জীবনে পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের মূল্য, জ্বালানি সংকট, কর্মসংস্থান ও জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ রয়ে গেছে। ফলে প্রথম ছয় মাসের উদ্যোগের পর এখন মূল প্রশ্ন—এসব পরিকল্পনা কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।
সামাজিক সুরক্ষায় নতুন কর্মসূচি
সরকারের প্রথম ছয় মাসের আলোচিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার কার্ড’ চালু, কৃষিঋণ মওকুফ, খাদ্য মজুত বাড়ানো, তরুণ উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে নতুন কর্মসূচি।
নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিকে সরকারের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মাস্টার প্ল্যানের মতো বড় প্রকল্প নিয়েও কাজ এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
অর্থনীতিতে সংস্কারের চ্যালেঞ্জ
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার ও বিনিয়োগে অনাস্থার মতো সংকট ছিল। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর দৃশ্যমান ফল পেতে আরও সময় লাগবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা না গেলে অর্থনীতিতে টেকসই সংস্কার সম্ভব হবে না।
এদিকে বিনিয়োগ বাড়ানো ও নতুন শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরিও সরকারের অন্যতম বড় লক্ষ্য। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করায় দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট বড় উদ্বেগ
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পরও সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ হয়ে আছে জীবনযাত্রার ব্যয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেন, গ্যাস পাইপলাইনের ত্রুটির কারণে সাম্প্রতিক সংকট তৈরি হয়েছে এবং তা সমাধানে সরকার কাজ করছে। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রশাসনে গতি আনার চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয়তার সঙ্গে প্রশাসনের সব স্তর একই গতিতে কাজ করতে পারছে কি না, সেটিও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং জবাবদিহির ঘাটতির কারণে কিছু উদ্যোগ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। ফলে আগামী সময়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
কূটনীতিতে ভারসাম্যের চেষ্টা
পররাষ্ট্রনীতিতেও সরকার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তবমুখী কূটনীতি এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে অর্থনীতির প্রতি আস্থার ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরির চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর, সংবিধান সংস্কার এবং আন্দোলনের সময় সঙ্গে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখাও সরকারের সামনে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
বিএনপির ঘোষিত ‘রেইনবো নেশন’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের ধারণা বাস্তবায়নে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামনে আরও কঠিন ছয় মাস
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে বেশ কিছু নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার বাস্তব ফলাফল এখনও পুরোপুরি মূল্যায়নের পর্যায়ে আসেনি। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো এখন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুর রাজ্জাক খান মনে করেন, সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি হলেও সেই প্রত্যাশার পুরো প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি। তবে ছয় মাসকে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় না বলেও তিনি আগামী ছয় মাসের কার্যক্রমের দিকে নজর রাখার কথা বলেন।
অন্যদিকে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও দ্রুত বাজেট ঘোষণাকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখেছেন। তবে নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানি সরবরাহ ও জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ এখনও কাটেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে উদ্যোগ ও পরিকল্পনার সময় হিসেবে দেখা গেলেও এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী ছয় মাসে সরকারের কার্যক্রমের গতি ও বাস্তবায়ন সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে প্রথম বছরের সাফল্যের চিত্র।