১৭ আগস্টের সেই ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলার ২১ বছর

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ইতিহাসে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার এক কালো অধ্যায় রচিত হয়। সেদিন মুন্সীগঞ্জ ছাড়া দেশের ৬৩ জেলার প্রায় সাড়ে ৪০০ স্থানে একযোগে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)। আদালত, বিমানবন্দর, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা ছিল হামলার অন্যতম লক্ষ্য।
একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ হামলায় দুজন নিহত এবং অন্তত ১০৪ জন আহত হন।
পুলিশ সদর দপ্তর ও র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, সিরিজ বোমা হামলার পর সারাদেশে ১৫৯টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) ১৮টি, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপি) ৮টি, রাজশাহী মহানগর পুলিশে (আরএমপি) ৪টি, খুলনা মহানগর পুলিশে ৩টি এবং বরিশাল মহানগর পুলিশে ১২টি মামলা হয়। এছাড়া বিভিন্ন রেঞ্জ ও রেলওয়ে পুলিশেও মামলা করা হয়।
এসব মামলার মধ্যে ১৪২টির অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়। বাকি ১৭টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলেও আসামিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
পুলিশের হিসাবে, মামলাগুলোতে মোট ৯৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১ হাজার ৭২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত ১৫৯ মামলার মধ্যে ৯৪টির বিচার শেষ হয়েছে। এসব মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে ৩৩৪ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। আরও ৫৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যেখানে আসামির সংখ্যা ৩৮৬ জন।
সিরিজ বোমা হামলার মামলাগুলোতে কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে আটজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় অনেক আসামি অব্যাহতি ও খালাস পেয়েছেন এবং কেউ কেউ জামিনে রয়েছেন।
এরপরও থামেনি জঙ্গি তৎপরতা
১৭ আগস্টের সিরিজ হামলার পরও দেশে একের পর এক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। ২০০৫ সালের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরের আদালতে বোমা বিস্ফোরণে তিনজন নিহত এবং বিচারকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন।
এরপর সিলেটে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিপ্লব গোস্বামীর ওপর বোমা হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনায় বিচারক ও তার গাড়িচালক আহত হন।
১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বিচারকদের বহনকারী গাড়িতে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। এতে ঝালকাঠি জেলা জজ আদালতের বিচারক জগন্নাথ পাঁড়ে ও সোহেল আহম্মদ নিহত হন।
২০০৭ সালের ৩০ মার্চ ওই দুই বিচারক হত্যার মামলায় জেএমবির শীর্ষ ছয় নেতা—শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, আব্দুল আউয়াল, খালেদ সাইফুল্লাহ ও সালাউদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
গাজীপুর ও চট্টগ্রামেও আত্মঘাতী হামলা
২০০৫ সালের ২৯ নভেম্বর গাজীপুর বার সমিতির লাইব্রেরি ও চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। গাজীপুরে আইনজীবীর পোশাকে এক জঙ্গি প্রবেশ করে বিস্ফোরণ ঘটালে আইনজীবীসহ ১০ জন নিহত হন।
একই দিনে চট্টগ্রাম আদালত চত্বরে হামলায় পুলিশ কনস্টেবল রাজিব বড়ুয়াসহ দুজন নিহত হন। আহত হন পুলিশ সদস্যসহ প্রায় অর্ধশত মানুষ। এর কয়েক দিন পর ১ ডিসেম্বর গাজীপুর ডিসি কার্যালয়ের গেটে বোমা বিস্ফোরণে কৃষি কর্মকর্তা আবুল কাশেম নিহত হন এবং অন্তত ৪০ জন আহত হন।
৮ ডিসেম্বর নেত্রকোনায় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ের সামনে আত্মঘাতী বোমা হামলায় সংগঠনটির দুই নেতাসহ আটজন নিহত হন। আহত হন শতাধিক মানুষ। ২০০৫ সালের এসব ধারাবাহিক জঙ্গি হামলায় বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন নিহত এবং চার শতাধিক মানুষ আহত হন।
দুই দশকেরও বেশি সময় পরও ১৭ আগস্টের সেই সিরিজ বোমা হামলা বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে আছে। প্রতিবছর দিনটি ফিরে আসে দেশের নিরাপত্তা ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাগিদ নিয়ে।