সরকারের ১৮০ দিন: স্বাস্থ্য খাতে উদ্যোগের ছড়াছড়ি, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানো, চিকিৎসাসেবার মান বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের অসম বণ্টনসহ নানা সংকট এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য খাতকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সামনে রেখে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়। চলতি সময়ে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা খাতটির জন্য এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ বলে জানিয়েছে সরকার।
তবে সরকারের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের শুরুতেই বড় ধাক্কা আসে হাম পরিস্থিতি নিয়ে। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাম ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত শিশুদের চাপ বাড়তে থাকে। পাঁচ মাসে হাম ও হামের উপসর্গে ৯০৮ শিশুর মৃত্যুর তথ্য সামনে এসেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করলেও রোগ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এর মধ্যেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে।
টিকাদান ও হাসপাতাল সম্প্রসারণে গুরুত্ব
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাম আক্রান্তদের একটি বড় অংশ টিকা না নেওয়ায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে ১০ লাখের বেশি নতুন টিকা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দিতে উপজেলা হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ৫০ বা ১০১ শয্যার পরিবর্তে এসব হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস ইউনিট, শিশুদের জন্য ২৫ শয্যার কেয়ার সেন্টার এবং জরুরি ব্যবস্থাপনার জন্য অতিরিক্ত ১৫টি শয্যা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোও সম্প্রসারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনবল সংকট কাটানোর উদ্যোগ
স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অন্যতম সমস্যা জনবল সংকট। এ সংকট মোকাবিলায় প্রায় ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ২ হাজার ৫০০ টেকনিশিয়ান ও ২ হাজার ৫০০ নার্স নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৯৩০টি ডায়ালাইসিস মেশিন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের অনুমোদনও পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ডিজিটাল ব্যবস্থায় নজরদারি
স্বাস্থ্যসেবায় শৃঙ্খলা ও চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানান, চিকিৎসকদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণে ডিজিটাল হাজিরা ও ফেস রিকগনিশন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ‘জিও ফেন্সিং’ ও ‘ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোন চিকিৎসক কোথায় দায়িত্ব পালন করছেন, তা রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
বাড়ি বাড়ি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর পরিকল্পনা
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব জানান, অনুমোদিত শূন্য পদগুলোর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ৮০০টির বেশি পদ পূরণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন।
ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র, ইউনিয়ন সাব-সেন্টার এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ‘প্রাইমারি হেলথ বক্স’ ও সাইকেল দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বাড়িতে গিয়ে রক্তচাপসহ কিছু প্রাথমিক পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হবে।
ই-হেলথ কার্ডসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
স্বাস্থ্য খাতে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল চিকিৎসা ব্যয় কমানো, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা অবকাঠামোর উন্নয়ন।
প্রতিটি নাগরিককে ইলেকট্রনিক হেলথ বা ই-হেলথ কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য প্রতিটি জেলায় আধুনিক সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওষুধ, স্বল্পমূল্যে ক্যানসারসহ জটিল রোগের ওষুধ এবং বিনামূল্যে দেশীয় ভ্যাকসিন সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি সচেতনতা, নিরাপদ পানি, জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি চিকিৎসাসেবা জোরদারের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
দুর্নীতি রোধে নজরদারি
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বলেন, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও কেনাকাটায় অনিয়ম বন্ধে কাজ চলছে। একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
তবে স্বাস্থ্য খাতের এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। হাম ও ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক রোগের চাপ, চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এবং হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে পরিকল্পনার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে পরিকল্পনা ও উদ্যোগের ঘাটতি না থাকলেও এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সেগুলোর দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন।