বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

গুম-খুনের বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে

গুম-খুনের বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে
ছবি: এআই
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণের আস্থা। আর সেই আস্থার ভিত্তি হলো আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানুষের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা। কিন্তু দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, বেআইনি আটক, রাজনৈতিক নিপীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণসহ বহুমুখী মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আঘাত নয়; এগুলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপরও গভীর ক্ষত তৈরি করে।

গুম একটি পরিবারের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। একজন মানুষ হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলেন, তার অবস্থান সম্পর্কে পরিবার কোনো তথ্য পেল না, বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও নিশ্চিত হতে পারল না তিনি জীবিত নাকি মৃত—এমন অনিশ্চয়তা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হেফাজতে নির্যাতন কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসকে ধ্বংস করে।

কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতাকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া। যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক নির্দেশের কাছে নতিস্বীকার করে, তখন নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার বদলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে গুম-খুনের অভিযোগগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না; এর পেছনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, রাজনৈতিক নির্দেশনা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।

তবে বিচার নিশ্চিত করার নামে প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করাও কাম্য নয়। অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয়, পদমর্যাদা কিংবা ক্ষমতার অতীত কোনো কিছুই তাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না। আবার অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী। প্রয়োজন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর তদন্ত এবং স্বাধীন বিচারিক প্রক্রিয়া।

গুম ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারকে কেন্দ্র করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া দরকার। নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান, তাকে সর্বশেষ কোথায় দেখা গেছে, কোন সংস্থা তাকে আটক করেছিল কি না, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল—সবকিছু নথিভুক্ত ও যাচাই করতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়, সেসব ঘটনার দায় নির্ধারণ করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা, তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার শুধু অতীতের হিসাব মেলানোর বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তাও। রাষ্ট্র যদি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে গুম, নির্যাতন, হত্যা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার কোনো অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না, তাহলে ভবিষ্যতে এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সহজ হবে। অন্যদিকে অপরাধীরা যদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দায়মুক্তি পেয়ে যায়, তাহলে ক্ষমতাসীনদের কাছে একটি বিপজ্জনক বার্তা যাবে—ক্ষমতায় থাকলে অপরাধ করলেও একসময় পার পাওয়া সম্ভব।

এ কারণে শুধু কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করাই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া মানা, হেফাজতে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

গুম-খুনের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন কমিশন বা উপযুক্ত বিচারিক কাঠামো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট সময় পরপর জনসাধারণকে অবহিত করা এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারকে তথ্য দেওয়াও প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাষ্ট্রকে প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারের পথ বেছে নিতে হবে। একটি কর্তৃত্ববাদী সময়ের অন্যায় আরেকটি অন্যায়ের মাধ্যমে সংশোধন করা যায় না। যারা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে; একই সঙ্গে যারা নির্দোষ, তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে।

একটি নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি কেবল নির্বাচন নয়। সেই ভিত্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো—রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে ইচ্ছেমতো তুলে নিতে পারবে না, কাউকে গোপনে হত্যা করতে পারবে না, নির্যাতন করতে পারবে না এবং রাজনৈতিক মতের কারণে কাউকে নিপীড়ন করতে পারবে না।

তাই পতিত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের গুম-খুন ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়সংগত বিচার এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন কোনো সরকার বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আবারও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিকের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আইন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং কার্যকর জবাবদিহি। অতীতের অন্যায়ের বিচারই পারে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করতে।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন