বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কারিগর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি আর নেই

চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কারিগর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি আর নেই
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

চীনের অর্থনীতিকে আমূল পরিবর্তনের পথে নিয়ে যাওয়া এবং দেশটিকে বৈশ্বিক উৎপাদন ও বাণিজ্যের অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। বুধবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সময় বুধবার সকাল ১১টার দিকে বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঝু রংজি।

১৯৯০-এর দশকে চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ঝু। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের পুনর্গঠন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) চীনের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দেশটির অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার কার্যকর করেন।

ঝুর নেতৃত্বে লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ ও লাভজনক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারালেও চীনের শিল্প ও অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামুখী করার ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে এই সংস্কার দেশটির দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

চীনের সাবেক নেতা দেং শিয়াওপিংয়ের সংস্কার কর্মসূচিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ঝুর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তার সময়ে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার পথ সুগম করে। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০০১ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ডব্লিউটিওর সদস্য হয় চীন।

ডব্লিউটিওতে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের প্রবেশ আরও বিস্তৃত হয়। দেশটির রপ্তানি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়।

কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন ঝু

ঝু রংজি ছিলেন স্পষ্টভাষী ও কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। দুর্নীতি, সরকারি ব্যর্থতা ও প্রশাসনিক অদক্ষতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই অবস্থান নিতেন তিনি। এ কারণে চীনে তিনি ‘বস’ এবং ‘পাগলা ঝু’ নামে পরিচিতি পান।

১৯৯৮ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এখানে ১০০টি কফিন প্রস্তুত রেখেছি; ৯৯টি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য এবং একটি আমার নিজের জন্য।’

সরকারের ব্যর্থতার দায় নিজের ওপর নেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানির পর বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়মের সমালোচনা করেন তিনি। পরে দক্ষিণ চীনের একটি বিদ্যালয়ে বিস্ফোরণে বহু মানুষ নিহত হলে জাতীয় টেলিভিশনে জনগণের কাছে ক্ষমাও চান।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঝু রংজি চীনের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণের পাশাপাশি লোকসানি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঋণপ্রবাহ কমানোর উদ্যোগ নেন তিনি।

স্থানীয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা সত্ত্বেও এসব সংস্কার বাস্তবায়নে তিনি কঠোর অবস্থানে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও একই ধরনের নীতির মাধ্যমে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করেন।

ব্যক্তিগত আবাসন খাতেও পরিবর্তন

ঝুর সময় চীনের আবাসন খাতেও বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৯৮ সালে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আবাসন বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে বাড়ি কেনার প্রবণতা বাড়ে এবং পরবর্তী এক দশকে শহরাঞ্চলের অধিকাংশ আবাসন ব্যক্তিমালিকানায় চলে যায়।

তবে ঝু পুরোপুরি মুক্তবাজার অর্থনীতির সমর্থক ছিলেন না। রাষ্ট্রীয় মালিকানা বজায় রেখেই ব্যাংক, বিমান সংস্থা, তেল কোম্পানি ও অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক ও দক্ষ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পক্ষে ছিলেন তিনি।

কঠিন রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বে

১৯২৮ সালের ২৩ অক্টোবর হুনান প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন ঝু রংজি। কর্মজীবনের শুরুতে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৫৭ সালে হাঙ্গেরি ও যুগোস্লাভিয়ার অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশংসা করায় তাকে ‘ডানপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে তার কর্মজীবন দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হয়।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ও তাকে প্রত্যন্ত এলাকায় শারীরিক শ্রম করতে পাঠানো হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে পুনর্বাসিত হওয়ার পর দ্রুত প্রশাসনিক পদে উন্নীত হন তিনি।

১৯৮৭ সালে সাংহাইয়ের ডেপুটি পার্টি সেক্রেটারি এবং পরের বছর মেয়র হন ঝু। ১৯৮৯ সালে সাংহাইয়ের মেয়র থাকাকালে রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তার তুলনামূলক সংযত ভূমিকা তাকে আলাদা পরিচিতি দেয়।

১৯৯১ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৯৩ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কাঠামোর স্থায়ী কমিটির সদস্য হন তিনি। ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারে আরও বড় ভূমিকা রাখেন।

প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসরের পর জনসমক্ষে তার উপস্থিতি অনেকটাই কমে যায়। তবে চীনের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা এবং রাষ্ট্রীয় শিল্পের সংস্কারে ঝু রংজির ভূমিকা দেশটির আধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।


সূত্র: এপি, এনবিসি নিউজ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন