শিক্ষায় আমূল সংস্কারের পথে চীন, সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে

জনসংখ্যা হ্রাস, পরিবর্তনশীল শ্রমবাজার এবং শিল্প খাতের নতুন চাহিদার সঙ্গে উচ্চশিক্ষাব্যবস্থাকে মানিয়ে নিতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে চীন। নতুন নির্দেশিকায় দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একই ধরনের কাঠামো অনুসরণ না করে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও বিশেষায়িত ভূমিকা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও মন্ত্রিপরিষদ—স্টেট কাউন্সিল যৌথভাবে উচ্চশিক্ষা সংস্কারের এই নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের বয়সী জনসংখ্যার পরিবর্তনশীল প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করতে বলা হয়েছে।
নতুন নীতিতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূলত তিন ধরনের ভূমিকার ভিত্তিতে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। উচ্চমানের গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতীয় কৌশলগত গবেষণা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা অর্জনে কাজ করবে। প্রায়োগিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আঞ্চলিক উন্নয়ন ও শিল্প খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি পূরণে গুরুত্ব দেবে। আর কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আধুনিক শিল্পের উপযোগী দক্ষ কর্মী তৈরিতে মনোযোগ দেবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান, বাস্তব অবদান ও নিজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে আলাদা আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে।
সাংহাইয়ের টংজি ইউনিভার্সিটির শিক্ষা মূল্যায়ন গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ফ্যান শিউদি বলেন, অতীতে চীনের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই নিজেদের সেরা মানের পূর্ণাঙ্গ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় ছিল। কিন্তু সব শিক্ষার্থীর একাডেমিক সক্ষমতা এক নয় এবং প্রত্যেকের দক্ষতা ও সীমাবদ্ধতাও আলাদা।
তিনি বলেন, আগে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত মানুষের মধ্যে ছিল। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ অনেক বেশি মানুষের জন্য উন্মুক্ত। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাকেও পরিবর্তিত জনসংখ্যার প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে।
চীনের উচ্চশিক্ষা সংস্কারের পেছনে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন জাতীয় আদমশুমারি ও শিক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বয়সী জনসংখ্যা কমছে।
বেইজিং নর্মাল ইউনিভার্সিটির গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে চীনে বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বয়সী মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩২ কোটি ৮০ লাখ। ২০৩৫ সালের মধ্যে তা কমে প্রায় ২৫ কোটিতে নেমে আসতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বয়সী তরুণদের সংখ্যা ২০৩২ সালের পর আরও দ্রুত কমতে শুরু করবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
অন্যদিকে, গত এক দশকে চীনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উচ্চশিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪ কোটি ৮৭ লাখে পৌঁছেছে। একই সময়ে মোট ভর্তির হার দাঁড়িয়েছে ৬১ দশমিক ৩ শতাংশে, যা ২০১২ সালের ৩০ শতাংশের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এত বড় পরিসরের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা একটি মাত্র মডেলে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও অবস্থান তৈরি করতে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।
টংজি ও ফুদান ইউনিভার্সিটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নীতি-গবেষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশ্লেষণে বলেছেন, জনসংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে কঠিন শ্রমবাজার ও তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে জনশক্তি ব্যবহারের ধরনও বদলাতে হচ্ছে। শিল্পের আধুনিকায়নও নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থী কমে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেটের ওপর চাপ এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ আরও তীব্র হওয়ার আগেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের কাঠামো ও শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনার সুযোগ করে দেওয়াই নতুন নির্দেশিকার অন্যতম লক্ষ্য।