মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট: সাময়িক সমাধান নয়, চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট: সাময়িক সমাধান নয়, চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
ছবি: এআই
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি, গ্যাসের সংকট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির অপর্যাপ্ততা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর নিজের মুখে এ ঘাটতির জন্য দুঃখপ্রকাশের বিষয়টি সংকটের গভীরতাই স্পষ্ট করে।

রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। গ্যাস সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বিকল থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। একটি বয়লারের কার্যক্রম চালু হলেও পুরো এফএসআরইউ সচল করতে গেলে সেটিও বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে সংকট পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কেবল একটি নির্দিষ্ট খাতের বিষয় নয়; দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুর সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, ব্যবসার ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে ভোক্তার ওপর।

বিশেষ করে গ্যাসের সংকটের প্রভাব বহুমুখী। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা, সার কারখানা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতেও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট একে অপরকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা সম্পর্কে কি দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা রয়েছে? প্রতিবছর গ্রীষ্ম বা চাহিদা বাড়ার মৌসুমে যদি একই ধরনের সংকট দেখা দেয়, তাহলে শুধু জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। বরং উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ, আমদানি নির্ভরতা, অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

এলএনজি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও নতুন করে ভাবার বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ওঠানামা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে তার প্রভাব পড়ে। তাই আমদানির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো, গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা উন্নত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। কোথাও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি না থাকলে সেই সক্ষমতা কাজে আসে না। আবার উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঠিকভাবে সঞ্চালন ও বিতরণ করা না গেলে ভোক্তা তার সুফল পায় না। তাই পুরো ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে।

সরকার দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধানের কথা বলছে—এটি ইতিবাচক। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যেন শুধু নীতিপত্র বা প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কোন সময়ে কত বিদ্যুৎ ও গ্যাস প্রয়োজন হবে, তার নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস, কোন উৎস থেকে জ্বালানি আসবে, আমদানির ঝুঁকি কীভাবে কমানো হবে এবং সংকটকালে বিকল্প ব্যবস্থা কী থাকবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা দরকার।

এ ক্ষেত্রে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নানা প্রকল্প, চুক্তি ও বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় অর্থনৈতিকভাবে টেকসই প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত না হলে বড় ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারবে না।

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে তাই কেবল সংকটের সময়ের ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তির অংশ। বর্তমান ঘাটতির জন্য দুঃখপ্রকাশ অবশ্যই দায়িত্বশীলতার পরিচয়; কিন্তু জনগণ শুধু দুঃখপ্রকাশ নয়, কার্যকর সমাধান দেখতে চায়।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে স্থিতিশীল করতে হলে স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সঞ্চালন-বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন—সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তবেই শিল্প, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির গতিশীলতা টেকসই হবে।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন