বিনিয়োগের চাকা থমকে গেলে অর্থনীতিও থেমে যায়

একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি বেসরকারি বিনিয়োগ। নতুন শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান, উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ—সবকিছুর ভিত্তি হলো উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের সাহস ও আস্থা। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো সেই আস্থার সংকট। রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগের গতি এখনও আশানুরূপ নয়। বরং অধিকাংশ উদ্যোক্তা নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকেই সবচেয়ে নিরাপদ পথ মনে করছেন।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটিই শেষ কথা নয়। একজন উদ্যোক্তা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, নীতির ধারাবাহিকতা, অর্থায়নের সুযোগ এবং উৎপাদন ব্যয়ের হিসাব বিবেচনা করে। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যায়। বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে সেই অনিশ্চয়তার চিত্রই স্পষ্ট।
উচ্চ সুদহার এখন শিল্প বিনিয়োগের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। যখন শিল্পঋণের সুদ দুই অঙ্কে পৌঁছে যায়, তখন নতুন কারখানা স্থাপন বা ব্যবসা সম্প্রসারণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং ডলারবাজারের অস্থিরতা। ফলে উদ্যোক্তারা লাভের সম্ভাবনার চেয়ে ঝুঁকির হিসাবই বেশি করছেন।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, তারল্য সংকট এবং নতুন ঋণ অনুমোদনে সতর্ক অবস্থানের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছে না। আবার কর ও শুল্কনীতির ঘন ঘন পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তুলছে। একটি শিল্পপ্রকল্পের পরিকল্পনা সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছরের জন্য করা হয়। কিন্তু নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা না থাকলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেক খাতেই বিক্রি কমেছে। বাজারে চাহিদা না বাড়লে উদ্যোক্তারা নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করতে আগ্রহী হবেন না—এটাই স্বাভাবিক। একই কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন অপেক্ষার কৌশল গ্রহণ করছেন। তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সহজ ব্যবসা পরিবেশ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে সমান গুরুত্ব দেন।
এ বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় সংকট মূলধনের নয়, আস্থার। উদ্যোক্তাদের হাতে বিনিয়োগের সক্ষমতা থাকলেও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তাদের সিদ্ধান্তকে আটকে দিচ্ছে। এই আস্থাহীনতা দীর্ঘায়িত হলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের করণীয়ও স্পষ্ট। সহনীয় সুদহার নিশ্চিত করা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ডলারবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং কর ও বিনিয়োগনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগবিমুখ নন; তারা কেবল অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। সেই অনিশ্চয়তা দূর করে আস্থার পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলেই বিনিয়োগের চাকা আবারও ঘুরবে। আর বেসরকারি বিনিয়োগে নতুন গতি ফিরলে অর্থনীতিও ফিরে পাবে তার কাঙ্ক্ষিত প্রাণশক্তি।