বিএম ডিপো থেকে ফেরদৌস শিপইয়ার্ড; আর কত প্রাণ গেলে জাগবে নিরাপত্তাবোধ?

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিল্প দুর্ঘটনা যেন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকটের প্রতিচ্ছবি। একের পর এক দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু হচ্ছে, পরিবারগুলো স্বজন হারাচ্ছে, আহতরা পঙ্গুত্বের বোঝা বইছেন। প্রতিবারই দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হচ্ছে, নিরাপত্তা জোরদারের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণের ঘোষণা আসছে। কিন্তু কিছুদিন পরই যেন সবকিছু আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—শ্রমিকের জীবন রক্ষায় আমরা আসলে কতটা আন্তরিক?
২০২২ সালের বিএম কনটেইনার ডিপোর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ, ২০২৩ সালে সীমা অক্সিজেন প্ল্যান্টের বিস্ফোরণ এবং সর্বশেষ ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে নয় শ্রমিকের মৃত্যু একই বাস্তবতার দিকে আঙুল তুলছে। দুর্ঘটনার ধরন আলাদা হলেও প্রতিটি ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তদারকি এবং দায়িত্বশীলতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল দুর্ঘটনা নয়; সমস্যাটি হলো দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের সামগ্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা।
ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি সম্পর্কে যথাযথ সতর্কতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নটি সামনে এসেছে। একটি বদ্ধ স্থানে শ্রমিক প্রবেশের আগে সেখানে বিষাক্ত বা দাহ্য গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা—এসব শিল্প নিরাপত্তার মৌলিক বিষয়। তারপরও যদি শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, তাহলে তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ঘাটতি শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়। নিরাপত্তা ত্রুটি ধরা পড়ার পরও যদি উৎপাদন বা ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম চলতে থাকে এবং পরে প্রাণহানি ঘটে, তাহলে দায় শুধু দুর্ঘটনার মুহূর্তে উপস্থিত ব্যক্তিদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। মালিকপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্থার দায়িত্বও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিএম ডিপোর ঘটনায় ৫১ জনের প্রাণহানি ছিল দেশের শিল্প নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। কিন্তু সেই ঘটনার পরও যদি একই ধরনের প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে, তাহলে বুঝতে হবে আমরা শিক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছি। দুর্ঘটনার পর তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিবেদনে উঠে আসা সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, কোন নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ হচ্ছে না এবং কোথায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি থাকতে হবে।
শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই উৎপাদন খরচের অংশ হতে পারে না। একটি কারখানা বা শিপইয়ার্ডের উৎপাদন বন্ধ হলে অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে, কিন্তু একজন শ্রমিকের মৃত্যু হলে একটি পরিবারের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তার কোনো আর্থিক মূল্য নেই। তাই শিল্পায়নের সঙ্গে শ্রমিক নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু মালিকদের দায়িত্বশীল হলেই হবে না; রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকেও নিয়মিত পরিদর্শন, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আইন প্রয়োগে কঠোর হতে হবে।
ময়নাতদন্ত ছাড়া মরদেহ হস্তান্তরের মতো বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। দুর্ঘটনাজনিত বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য যথাযথ আইনি ও চিকিৎসাগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। কোনো প্রক্রিয়াগত দুর্বলতার কারণে যদি পরবর্তীতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে বিচার পাওয়ার পথও জটিল হতে পারে। তাই নিহত শ্রমিকের পরিবারের ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রতিটি ধাপ আইন অনুযায়ী সম্পন্ন করা দরকার।
শিল্প দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ কখনোই দায়মুক্তির বিকল্প হতে পারে না। একজন শ্রমিকের পরিবারকে কিছু অর্থ দিয়ে যদি দুর্ঘটনার দায় শেষ করে দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়। প্রয়োজন হলো—কার গাফিলতিতে দুর্ঘটনা ঘটেছে, কোথায় নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে এবং কোন কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা। অপরাধ বা অবহেলা প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সীতাকুণ্ড বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানে ভারী শিল্প, জাহাজভাঙা ও পুনর্ব্যবহার শিল্পসহ নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অর্থনীতির জন্য এসব শিল্প গুরুত্বপূর্ণ হলেও শ্রমিকের জীবনকে ঝুঁকিতে রেখে কোনো শিল্পায়ন টেকসই হতে পারে না। উন্নত শিল্পব্যবস্থার অন্যতম শর্তই হলো নিরাপদ কর্মপরিবেশ।
তাই এখন আর কেবল দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ, তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সময় নেই। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করতে হবে। নিয়মিত গ্যাস পরীক্ষা, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদেরও নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
বিএম ডিপো থেকে সীমা অক্সিজেন, সেখান থেকে ফেরদৌস শিপইয়ার্ড—ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি প্রাণহানি আমাদের রাষ্ট্র, শিল্পমালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি একই প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে: নিরাপত্তাবিধি কাগজে থাকবে, নাকি বাস্তবেও কার্যকর হবে?
আর কত শ্রমিকের মৃত্যু হলে আমরা বুঝব, একটি প্রাণ বাঁচানো একটি কারখানার উৎপাদন সচল রাখার চেয়েও বড় বিষয়? এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে পরবর্তী দুর্ঘটনার পরও হয়তো আমরা একই শোকবার্তা, একই তদন্ত কমিটি এবং একই আশ্বাস দেখতে পাব। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া প্রাণগুলো আর ফিরে আসবে না।