৪৮ বছরে বিএনপি: অর্জন, প্রত্যাশা ও দায়িত্বের নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। আন্দোলন-সংগ্রাম, ক্ষমতায় যাওয়া, বিরোধী দলে থাকা, রাজনৈতিক সংকট ও নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপির ইতিহাস দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেবল অতীতের সাফল্য স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; বরং একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নিজেদের কর্মকাণ্ড, নীতি, অর্জন, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য পর্যালোচনারও সময়। ৪৮ বছরে বিএনপির সামনে তাই আনন্দের পাশাপাশি আত্মমূল্যায়নেরও বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির যাত্রা শুরু হয়েছিল জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও দেশীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার রাজনৈতিক দর্শন সামনে রেখে। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি একাধিকবার সরকার পরিচালনা করেছে। দেশের রাজনীতিতে বিএনপির দীর্ঘ উপস্থিতি প্রমাণ করে, দলটির একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক ও জনভিত্তি রয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলেছে। জনগণের প্রত্যাশা বেড়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জ বহুমাত্রিক হয়েছে এবং রাজনীতিতে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। ফলে পুরোনো রাজনৈতিক সাফল্যকে পুঁজি করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনাতেই একটি দলের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হবে।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে জনগণের প্রত্যাশাকে রাজনৈতিক অঙ্গীকারে রূপ দেওয়া। দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতার মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ এবং বাস্তবায়নই রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
একই সঙ্গে দলীয় রাজনীতিতেও গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার করা জরুরি। নেতৃত্ব নির্বাচন, মতপ্রকাশের সুযোগ, তৃণমূলের অংশগ্রহণ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন একটি রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
বিএনপির সামনে আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক সহনশীলতা ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করা। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার নাম নয়; বিরোধী মতের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে বৃক্ষরোপণ, মৎস্য অবমুক্তকরণ ও আলোচনা সভার মতো উদ্যোগ রাখা হয়েছে। এসব কর্মসূচি রাজনৈতিক দলের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন হতে পারে। তবে প্রতীকী কর্মসূচির পাশাপাশি পরিবেশ, কৃষি, নদী, জলাশয় ও জনজীবনের বাস্তব সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
৪৮ বছরের পথ পেরিয়ে বিএনপির সামনে এখন নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। অতীতের অর্জন যেমন দলটির শক্তি, তেমনি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াও ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার পাশাপাশি রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সক্ষমতাই একটি দলের পরিপক্বতার পরিচয়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—কীভাবে আরও দায়িত্বশীল, গণমুখী, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়া যায়। জনগণের আস্থা অর্জন এবং তা ধরে রাখাই যেকোনো রাজনৈতিক দলের চূড়ান্ত সাফল্যের মাপকাঠি।
৪৮ বছরের অভিজ্ঞতা বিএনপিকে সেই পথের প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিয়েছে। এখন সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণে দলটি কতটা ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই হবে সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।