জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আমদানিনির্ভরতা কমানোর তাগিদ

দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি আর শুধু ‘চ্যালেঞ্জ’ নয়, এটি বড় ধরনের সমস্যায় রূপ নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) ড. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই সংকট মোকাবিলায় সরকার, শিল্পখাত, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) ডিএমকে লেকচার গ্যালারিতে ‘ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের প্রমাণভিত্তিক পথ: নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ ও ইনভেন্টরি স্টাডির ফলাফল’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের জ্বালানি বাজার বর্তমানে ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। পেট্রোলিয়ামের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। ২০১৫ সালে যেখানে প্রাথমিক জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা ১০ শতাংশেরও কম ছিল, বর্তমানে তা প্রায় ৬৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এই প্রবণতা কমাতে দেশীয় সম্পদ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট সমাধানে কৃষি খাতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। গবেষণা, প্রযুক্তি ও মাঠপর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একইভাবে জ্বালানি খাতেও গবেষণাভিত্তিক ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন।
দেশে প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি বড় মানবসম্পদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্যের অভাবও নীতিনির্ধারণে সমস্যা তৈরি করছে।
এ সমস্যা সমাধানে একটি আন্তর্জাতিক মানের কেন্দ্রীয় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ডেটা সেন্টার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জ্বালানি খাতের প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একটি একক প্ল্যাটফর্মে মানসম্মত তথ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা হবে।
বিইপিআরসির এই সদস্য আরও বলেন, জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় গবেষণাভিত্তিক নীতি গ্রহণ জরুরি। অনেক সময় গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করা যায় না বা প্রয়োজনীয় নীতিমালার অভাবে তহবিল ফেরত যায়। অথচ দেশীয় গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তুলনামূলক কম ব্যয়ে দেশের বাস্তব সমস্যা নিয়ে কার্যকর গবেষণা করতে পারে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যয়বহুল গবেষণার পরিবর্তে স্থানীয় গবেষকদের সক্ষমতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ লক্ষ্যে গবেষণা ও স্টাডি পরিচালনার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান।
তিনি বলেন, একাডেমিক গবেষণাকে শুধু আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা বা ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও শিল্পখাতের বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সেসব সমস্যা সমাধানে যুক্ত করতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎসহ সম্ভাবনাময় খাতে গবেষকদের নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব, বিশেষজ্ঞ সহায়তা ও অবকাঠামো নিশ্চিত করে কার্যকর গবেষণা পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
ড. রফিকুল ইসলামের মতে, সরকারের প্রয়োজন, শিল্পখাতের বাস্তবতা এবং একাডেমিয়ার গবেষণা সক্ষমতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা গেলে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতকে আরও টেকসই ও স্থিতিশীল করা যাবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম। ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ইনভেন্টরি অব বাংলাদেশ’ বিষয়ে উপস্থাপনা করেন আইইউবির লেকচারার মোহাম্মদ রেজওয়ান উদ্দিন এবং ‘রিনিউয়েবল এনার্জি এক্সপেনশন স্টাডি’ বিষয়ে উপস্থাপনা করেন অধ্যাপক খসরু মোহাম্মদ সেলিম।
অনুষ্ঠানে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, জলবায়ু ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।