রমজানের আগে বাজারে স্বস্তি ফেরাতে নজরদারি বাড়ানোর দাবি ব্যবসায়ীদের

আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার তদারকি আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, চাঁদাবাজি, অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগী এবং বাজারে কারসাজির কারণে উৎপাদন ও পাইকারি পর্যায়ের তুলনায় ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যায়।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত, সরবরাহ, আমদানি ও মূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে এ সভার আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক।
সভায় ব্যবসায়ীরা বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি থাকলে রমজানে পণ্যের কৃত্রিম সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব। একই সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় স্তর কমানো এবং চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজিতে বাড়ছে দাম
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি রয়েছে। এর সঙ্গে সড়ক ও বাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজিও যুক্ত হয়েছে। ফলে উৎপাদন পর্যায়ে কম দামে পাওয়া সবজি ভোক্তার কাছে কয়েক গুণ বেশি দামে পৌঁছাচ্ছে।
তিনি বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ৎ মালিক সমিতির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কর্মকাণ্ডের দায় সব ব্যবসায়ীর ওপর চাপছে। তাঁর অভিযোগ, করপোরেট পর্যায়ে প্যাকেটজাত পণ্যের দামও অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে নিচ্ছেন। পাশাপাশি বাজার ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কারও কারও বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
বাজার নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করার দাবি
খিলগাঁও (তালতলা) সিটি করপোরেশন সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব কাজী আনিসুজ্জামান বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা প্রয়োজন। এতে ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পাবেন।
ফকিরেরপুল বাজার সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির শওকত হোসেন বলেন, বিভিন্ন বাজারে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব নিয়ন্ত্রণকারীর পরিচয়ও বদলে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, নিয়মিত বাজার মনিটরিং না থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। তাঁর প্রশ্ন, এক রাতের ব্যবধানে একই পণ্যের দাম এতটা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী? বাজারে দৃশ্যমান না হলেও সিন্ডিকেটের প্রভাব ভোক্তাকে বহন করতে হচ্ছে।
ডাল-ছোলার দাম বাড়ার অভিযোগ
পালস অ্যান্ড ল্যান্টিল ক্রাশিং মিল মালিক সমিতির বিকাশ চন্দ্র সাহা জানান, গত ১০ দিনে ডাবলি ও ছোলার দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট নয় বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
বাড়তে পারে রুটি-বিস্কুটের দাম
রুটি-বিস্কুট প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, ময়দা, তেল ও চিনির দাম বৃদ্ধির কারণে বেকারি শিল্প চাপের মধ্যে রয়েছে। গত তিন মাসে প্রায় ২০টি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় এক হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, কাঁচামালের দাম বর্তমান অবস্থায় থাকলে আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে রুটি-বিস্কুটের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বাড়তে পারে।
চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি
নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের পরিচালক সোহেল আক্তার বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত না করলে বাজার মনিটরিং কার্যকর করা কঠিন। তিনি বাজার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত খরচ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ধরেন।
তাঁর দাবি, এসব বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করেন। ফলে এর চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
সরবরাহকারী কমে যাওয়ায় সংকটের শঙ্কা
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, ব্যাংকিং জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং নানা ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতায় অনেক প্রতিষ্ঠান ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা থেকে সরে গেছে।
বর্তমানে অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজারের বড় অংশ থাকায় প্রতিযোগিতা কমে গেছে বলে মনে করেন তিনি। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার ব্যবসায় ফিরিয়ে আনা না গেলে ভবিষ্যতে ভোজ্যতেল ও চিনির সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
চিনির বাজার নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা
মেঘনা গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপ-মহাব্যবস্থাপনা পরিচালক তসলিম শাহরিয়ার বলেন, ভারত বড় চিনি রপ্তানিকারক দেশ হলেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় চিনি আমদানি শুরু করেছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে ব্রাজিলে চিনির দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে বলে তিনি জানান।
তবে তাঁর দাবি, দেশের মিলগেট পর্যায়ে চিনির দাম এখনো স্থিতিশীল রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, রমজানে পণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। তাই আগে থেকেই সরবরাহ নিশ্চিত করা, মজুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং বাজারে নিয়মিত অভিযান চালানো গেলে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব। একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে নতুন ও পুরোনো ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।