ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: প্রত্যাশার তুলনায় সাফল্য কতটা

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি একটি নির্বাচিত সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়ন, অর্থনীতি কিংবা রাষ্ট্র সংস্কারের অন্য কোনো অর্জনই সাধারণ মানুষের কাছে স্বস্তি এনে দিতে পারে না। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে যে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছিল, তা থেকে উত্তরণের প্রত্যাশা ছিল নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসের চিত্র বলছে, সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই—এই ছয় মাসে সারাদেশে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মামলা হয়েছিল ৮৯ হাজার ১২টি। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে মামলার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১১ হাজার। রাজধানীতেও পরিস্থিতি খুব স্বস্তিদায়ক নয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-জুলাই সময়ে ঢাকায় বিভিন্ন অপরাধে ৮ হাজার ৪৪টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে এ সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৬৬৫।
তবে শুধু মামলার সংখ্যা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না—এ কথাটিও মনে রাখা জরুরি। থানায় মামলা গ্রহণের প্রবণতা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরাধের ধরন, পুলিশের সক্রিয়তা এবং মানুষের আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ—সবকিছুর ওপর মামলার সংখ্যা নির্ভর করে। ফলে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তারপরও ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে রাজধানীতে এক হাজার ৩৮৭ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় থাকার তথ্যটি উদ্বেগজনক। তাদের বড় একটি অংশ একাধিক মামলার আসামি হওয়া আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি করে। একজন অপরাধী বারবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়লে বোঝা যায়, অপরাধ প্রতিরোধ ও বিচারিক ব্যবস্থার কোথাও না কোথাও দুর্বলতা রয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক হামলা, পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি অপরাধ পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। অপরাধীরা যখন রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতায় দুর্বলতা দেখতে পায়, তখন তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। একই সঙ্গে অপরাধের পর দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে বর্তমান সরকারের ছয় মাসের একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। আগের সময়ের তুলনায় ‘মব’ বা দলবদ্ধভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমেছে বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এটি অবশ্যই স্বস্তির বিষয়। কিন্তু মব কালচার কমে যাওয়া মানেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সরকারের পক্ষ থেকে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা এসেছে। পুলিশও বলছে, অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের পর জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে ধারাবাহিকতা, পেশাদারত্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে আইন প্রয়োগের ওপর।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রথমেই পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনা জরুরি। একজন পুলিশ সদস্য যদি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার পরও ন্যায়বিচার না পান, তাহলে তার মধ্যে দায়িত্ব পালনের আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। একইভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় বদলি, পদায়ন কিংবা দায়িত্ব বণ্টনের সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাদারত্বকে প্রাধান্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করতে হবে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে না। অপরাধ সংঘটনের কারণগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। মাদক, বেকারত্ব, কিশোর অপরাধ, পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা, নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—এসব বিষয় অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত বিচার, জামিন ব্যবস্থার কার্যকর নজরদারি এবং মামলার তদন্তে দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।
রাজধানী ও দেশের অন্যান্য এলাকায় অপরাধীরা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে আত্মগোপন করছে—এটিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয় বাড়িয়ে এ ধরনের অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে। শুধু ঘটনার পর গ্রেফতার নয়, অপরাধ সংঘটনের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও চক্র শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। অপরাধী যে দলের, মতের কিংবা পরিচয়েরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে একইভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। আইনের প্রয়োগে বৈষম্য থাকলে মানুষের আস্থা নষ্ট হবে এবং অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হবে।
নতুন সরকারের ছয় মাস এখনো দীর্ঘ সময় নয়। তাই এই সময়ের পরিসংখ্যান দিয়ে পুরো মেয়াদের সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন করাও ঠিক হবে না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দূর করতে হলে বক্তব্যের চেয়ে দৃশ্যমান ফলাফল প্রয়োজন। অপরাধের শিকড় চিহ্নিত করে প্রতিরোধ, দক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার, পুলিশের মনোবল বৃদ্ধি এবং আইনের সমান প্রয়োগ—এই পাঁচটি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের সবচেয়ে মৌলিক প্রত্যাশা নিরাপত্তা। সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে অন্য সব অর্জনই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—পরিসংখ্যানের উন্নতির পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনা। ছয় মাসে যে ঘাটতিগুলো স্পষ্ট হয়েছে, সেগুলো দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের পথে এগোনো সম্ভব হবে।