শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj

বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে, হুমকিতে লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ

বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে, হুমকিতে লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সর্বশেষ অগ্রগতির পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি এলাকাও তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর আগের দিন গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগর মোখা দখলের কথাও জানিয়েছিল গোষ্ঠীটি।

হুথিদের এই অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং লোহিত সাগর হয়ে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বাব আল-মান্দেব কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাব আল-মান্দেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। সংকীর্ণ এই প্রণালি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালকে এডেন উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

বিশ্ব বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এই নৌপথ দিয়ে চলাচল করে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ঝুঁকি বাড়ায় বাব আল-মান্দেবের কৌশলগত গুরুত্বও আরও বেড়েছে।

এই পথ ব্যবহার করে পারস্য উপসাগর এড়িয়ে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর পণ্য ও জ্বালানি লোহিত সাগর হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো সম্ভব। ফলে বাব আল-মান্দেব অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে এর প্রভাব শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

সৌদি তেল রপ্তানিতে নতুন ঝুঁকি

হরমুজ প্রণালিতে চলাচলে ঝুঁকি বাড়ার পর সৌদি আরব বিকল্প রপ্তানি পথ হিসেবে ইস্ট-ওয়েস্ট ক্রুড অয়েল পাইপলাইনের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে।

পাইপলাইনটি দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল পৌঁছে দেয়। এর ফলে পারস্য উপসাগরের পরিবর্তে লোহিত সাগর ব্যবহার করে তেল রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধের মধ্যে সৌদি আরব পাইপলাইনটির দৈনিক পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করেছে। আগে এর সক্ষমতা ছিল প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল।

ফলে সৌদি তেলের একটি বড় অংশ এখন লোহিত সাগর হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে। বাব আল-মান্দেব নৌপথও যদি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে চাপ তৈরি হতে পারে।

পুরো লোহিত সাগর কি বন্ধ করতে পারবে হুথিরা?

হুথিদের পক্ষে পুরো লোহিত সাগর দীর্ঘ সময় কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথটি বিশাল এবং এর নিরাপত্তায় বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী সক্রিয় রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, পুরো নৌপথ নিয়ন্ত্রণ করা হুথিদের জন্য জরুরি নয়। বাব আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারলেও বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করা সম্ভব।

জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়লে বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প পথ বেছে নিতে পারে। একই সঙ্গে বিমা কোম্পানিগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রিমিয়াম বাড়াতে পারে। এতে সরাসরি নৌপথ বন্ধ না হলেও পরিবহন ব্যয় ও সময় উভয়ই বেড়ে যেতে পারে।

এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য সরবরাহের ওপর। বাড়তে পারে জাহাজের বিমা ও পরিবহন খরচ, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যের দামেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সৌদি আরবের পাল্টা পদক্ষেপ

হুথিদের অগ্রগতি ঠেকাতে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী গত ২৪ ঘণ্টায় একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মোখাসহ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন এলাকাকে এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে এসব হামলা এখন পর্যন্ত হুথিদের অগ্রযাত্রা পুরোপুরি থামাতে পারেনি বলে বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

হুথিরা যদি বাব আল-মান্দেবের আশপাশে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক মাত্রা পেতে পারে। বিশেষ করে লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল ও উপসাগরীয় তেল রপ্তানির ওপর এর প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়, সেটিই এখন নজর রাখার বিষয়।


সূত্র: আল-জাজিরা
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ

আরও পড়ুন