শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • দুই দিনের ব্যবধানে কমল স্বর্ণের দাম, ভরিতে কমেছে ২১৫৮ টাকা সালাহউদ্দিন-মঈন খানের ওপর বাড়ল সংসদীয় দায়িত্ব আহত ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিনকে দেখতে সিএমএইচে প্রধানমন্ত্রী বাব আল-মান্দেবে হুথিদের অগ্রগতি, সৌদি আরব ঘিরে বাড়ছে নতুন উদ্বেগ পাকিস্তানের টেস্ট পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন, ‘অসম্মান করছে ক্রিকেটকে’ হয় আমি থাকব, না হয় হাসপাতালে অনিয়ম থাকবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগে আটক ২ ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার করা ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার: চিফ হুইপ ‘হরমুজ প্রণালির নাম হওয়া উচিত ট্রাম্প প্রণালি’: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন বেড়েছে ১৩ শতাংশ
  • বাব আল-মান্দেবে হুথিদের অগ্রগতি, সৌদি আরব ঘিরে বাড়ছে নতুন উদ্বেগ

    বাব আল-মান্দেবে হুথিদের অগ্রগতি, সৌদি আরব ঘিরে বাড়ছে নতুন উদ্বেগ
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের অগ্রগতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকে হুথিদের অগ্রসর হওয়ার দাবি করেছে ইয়েমেনের সামরিক সূত্র। এতে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

    হুথিদের এই অগ্রগতি শুধু ইয়েমেনের সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে না, সৌদি আরবের নিরাপত্তা, তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য নিয়েও তৈরি করছে নতুন শঙ্কা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগরের নৌপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

    মোখা দখলের পর দ্বীপপুঞ্জের দিকে অগ্রসর হুথিরা

    ১০ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়েছে হুথি বাহিনী বলে দাবি করা হয়েছে। ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রের ভাষ্য, হুথিরা কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও পৌঁছেছে।

    এতে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুথিদের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও পরবর্তী সময়ে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

    এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নভেম্বরের মধ্যবর্তী মার্কিন নির্বাচনের পর শেষ হতে পারে।

    কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব

    হুথিরা যদি বাব আল-মান্দেবের ওপর কার্যকর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে ইরানের জন্য তা বড় কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

    হরমুজ প্রণালির মতো বাব আল-মান্দেবও বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। হরমুজ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। যুদ্ধের কারণে ওই পথের চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগরের রুটের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

    চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাব আল-মান্দেব দিয়ে সৌদি আরবের সমুদ্রপথে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

    ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। এটি বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পণ্য পরিবহনের প্রায় ৫ শতাংশ।

    ফলে বাব আল-মান্দেবে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

    সৌদি জাহাজে হামলার হুমকি

    হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র জানিয়েছে, লোহিত সাগরে অন্যান্য নৌযানের চলাচল নিরাপদ থাকবে। তবে সৌদি আরবের জাহাজ এই নিরাপত্তার আওতায় থাকবে না বলে জানানো হয়েছে।

    এর অর্থ, সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করে হুথিদের অবরোধ ও হামলার হুমকি বহাল রয়েছে। এর আগে জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল হুথিরা। চলতি মাসে তাদের হামলা আরও জোরালো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

    এদিকে হুথিদের হামলার মধ্যে সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চতুর্থবারের মতো জরুরি সতর্কতা জারি করেছে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ।

    জাতিসংঘের সতর্কতা

    ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করে বলেছেন, ইয়েমেনের যুদ্ধ নতুন ও আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

    মোখার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের প্রবেশপথে তাদের সরাসরি উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে নৌযানের অবাধ চলাচল নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

    যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেনিফার নাইডহার্ট ডি অর্টিজ হুথিদের ইরানের ‘এজেন্ট ও হাতিয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হুথিদের উত্তেজনা বৃদ্ধি গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

    ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন মাত্রা

    মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে ইরান ও সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। সরাসরি সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে ইরান ইয়েমেন, লেবানন ও ইরাকের মতো দেশে মিত্র ও সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে প্রভাব ধরে রেখেছে বলে মনে করা হয়।

    হুথিদের সাধারণত ইরান-সমর্থিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও তাদের নিজস্ব সংগঠন, রাজনৈতিক লক্ষ্য ও স্বার্থ রয়েছে। দীর্ঘদিনের ইয়েমেন যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারে তারা উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি করেছে।

    ২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর সংঘাত বড় আকার নেয়। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা।

    ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বড় ধরনের লড়াই বন্ধ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবার সংঘাত তীব্র হয়েছে। চলতি সপ্তাহে হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের তেল স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

    তেলের বাজারে চাপ

    হুথিদের অগ্রগতির খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি।

    যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের জাতীয় গড় দামও প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে গ্যাসবাডি।

    হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথ একই সময়ে সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

    পাকিস্তানের সতর্কবার্তা, ইরানের অস্বীকার

    পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাকিস্তান ইরানকে হুথিদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়েছে বলে সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্রের বরাতে জানা গেছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে পাকিস্তান এই বার্তা তেহরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

    তবে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করে না।

    এদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক মক্কা চুক্তিও পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য দেশ হামলার শিকার হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। এরই মধ্যে সৌদি আরবে পাকিস্তানের সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েনের খবরও এসেছে।

    সামনে আরও বড় সংকট?

    ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের অগ্রগতি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় নৌপথে উত্তেজনা তীব্র। হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি এখন বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরও সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়েছে।

    বাব আল-মান্দেবে হুথিদের প্রভাব আরও বাড়লে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তেলের দাম বাড়লে ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টাও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

    ফলে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের অগ্রগতি এখন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিষয় নয়। এটি সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।


    সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, বিবিসি
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    আরও পড়ুন