মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম

গণপূর্তের সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের অভিযোগ

গণপূর্তের সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের অভিযোগ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে খুলনা জোনের দায়িত্বে থাকা এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, সরকারি বরাদ্দের কাজে অনিয়ম এবং বিভিন্নভাবে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।

অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে দুটি বাড়ি, পূর্বাচলে প্লট, টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি, একটি মার্কেট, একটি বিনোদনকেন্দ্র, রেস্টুরেন্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রে একটি ফ্ল্যাটসহ অর্ধশতাধিক কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। এসব সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস ও প্রকৃত মূল্য যাচাইয়ের কাজ চলছে।

সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। ওই সময় আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীম ও গোল্ডেন মনিরের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আজিমপুরে ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলার অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কয়েকজনের দাবি, আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ওই সময় তিনি ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ‘সিন্ডিকেট’ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদারের ভাষ্য, নির্দিষ্ট হারে অর্থ না দিলে অনেক ফাইল অনুমোদন বা স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতো। তাদের অভিযোগ, প্রায় ১০ শতাংশ অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন ফাইলে স্বাক্ষর করা হতো।

আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে এক নারী হিসাব সহকারীকে ঘিরেও নানা আলোচনা ছিল বলে কয়েকজন সূত্র দাবি করেছেন। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ, নথি বা নিরপেক্ষ তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সম্পদের তালিকায় বাড়ি, প্লট ও ব্যবসা

অনুসন্ধানের প্রাথমিক তথ্যে সাইফুর রহমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে যে সম্পদগুলোর কথা জানা গেছে, তার মধ্যে রয়েছে ঢাকার মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে দুটি বাড়ি। এ ছাড়া পূর্বাচলে একটি প্লট এবং টাঙ্গাইলের ঘাটাইল এলাকায় একটি ডুপ্লেক্স বাড়ির তথ্যও পাওয়া গেছে বলে সূত্রের দাবি।

টাঙ্গাইলের বাজার রোডে একটি তিনতলা মার্কেটের মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ সম্পদটি নিজের নয়, ভাইয়ের নামে এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া—এমন দাবি করেছেন সাইফুর রহমান।

এ ছাড়া সালাউদ্দিন সেনানিবাস মোড় এলাকায় আগে একটি এলপিজি ফিলিং স্টেশন ছিল, বর্তমানে সেখানে ‘সোনারতরী পার্ক’ নামে একটি স্থাপনার কথা জানা গেছে। এর কাছাকাছি প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের জমিতে ‘কাঠবাদাম’ নামের একটি রেস্টুরেন্ট থাকার তথ্যও এসেছে।

বিদেশে সম্পদের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রে একটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। সেখানে তার মেয়ে বসবাস করেন বলেও সূত্রটি জানিয়েছে। এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, বর্তমান বাজারমূল্য এবং অর্থের উৎস নির্ধারণে দলিল, রেজিস্ট্রি, ব্যাংক লেনদেন ও আয়কর নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ

সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে তিনি প্রভাব খাটিয়ে সরকারি উন্নয়নকাজ ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতেন।

এ ছাড়া আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীম ও গোল্ডেন মনিরের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের আন্দোলন ঘিরেও অভিযোগ

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নিয়ে গণহত্যায় অর্থ জোগানের ক্ষেত্রে সাইফুর রহমানের ভূমিকা ছিল—এমন অভিযোগও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের কাছ থেকে পাওয়া গেছে।

তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো আর্থিক লেনদেনের নথি, ব্যাংক হিসাব, মামলা বা তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

একইভাবে গোল্ডেন মনির ও জি কে শামীমের অর্থায়নে ঢাকার বিভিন্ন পাঁচতারা হোটেলে কথিত অসামাজিক কর্মকাণ্ডে সাইফুর রহমানের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

সম্পদের বিষয়ে যা বললেন সাইফুর

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাইফুর রহমানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে ফোনে তার কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরে হোয়াটসঅ্যাপে তাকে এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলে তিনি লিখিত বার্তায় কিছু সম্পদের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন। তার দাবি, টাঙ্গাইলের সম্পদগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এবং এজমালি সম্পত্তি। অন্য অভিযোগগুলো সত্য নয় বলেও তিনি জানান।

প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের

একজন সরকারি প্রকৌশলীর নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠলে তার সম্পদের বৈধ উৎস, আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য এবং সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম বা ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি, বিল-ভাউচার, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং ব্যাংক লেনদেন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সত্য হলে সরকারি অর্থ ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি গুরুতর। আর অভিযোগগুলো অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করাও জরুরি।

ফলে তার সম্পদ ও দায়িত্ব পালনকালের কর্মকাণ্ড নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন